২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার
--বিজ্ঞাপন-- Bangla Cars

একটা পুরনো ডায়েরিতে পুরনো আজব ঘটনা

অনল রায়হান
spot_img

একটা পুরোনো খাতা পেলাম। সেখানে আরও পুরোনো একটা আজব ঘটনা লেখা আছে। পড়তে গিয়ে সব মনে পড়ে গেল। কৈশোরে ডাক্তার দেখানোর এমন অভিজ্ঞতা কয়জনের আর হয়!

পামিষ্ট্রি নিয়ে মার আগ্রহ ছিল। এ কারনে, আমাদের হুমায়ুন রোডের বাড়িতে বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকজন পামিষ্ট এসেছেন, গেছেন। এরমধ্যে দুএকজন আবার পারিবারিক বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। ব্যাপারটা শুধু হাত দেখানোর মধ্যেই থাকতো না। কাসেম মামা প্রায়ই আত্মা নামাতেন। ঘরের বাতি নিভিয়ে, কখনও আলো জ্বেলেও প্ল্যানচেট হত। ঘরের ভেতরে-বাইরে কোনো শব্দ হতে পারবে না। মিডিয়ামের মনঃসংযোগ নষ্ট হবে তাতে।

একবার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের আত্মা এলেন। এ ছিল মায়ের সুপারিশ। রোগী হলাম আমি। আমার এক ধরনের খুশখুশে কাশি ছিল, কোনো ওষুধেই কাজ হচ্ছিল না। বড়দার ঘরে, একটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বিধানচন্দ্র রায় এলেন। মিডিয়াম কে ছিল মনে পড়ছে না (বড়দাও হতে পারে। মনে আছে, বড়দাও অনেকবার মিডিয়াম হয়েছিল)।

আমি তখন মাত্র হাই সেকশনে উঠেছি। সিক্সের স্টুডেন্ট। সুতরাং প্ল্যানচেট রুমে আমার প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে আত্মা যে শারীরিক অবয়বে আবির্ভূত হন না, সেটা জানতাম।

আমি এক্সাইটেড হয়ে আছি। আজ বিধানচন্দ্র রায় আসবেন এবং উপলক্ষটা আমি। রাত আটটা নটা হবে। প্ল্যানচেট রুমের বাইরে, মার বেডরুমে আমি আরও কে কে যেন দাঁড়ানো ছিলাম। বড়দার ঘরের দরজা লক করা। বাইরে গিয়ে বাগান থেকে জানালায় উঁকিঝুঁকি মারবো সেটাও সম্ভব না। কারন আমিই রুগী। ডাক্তারের কাছাকাছি থাকতে হবে। যদি উনি রুগী দেখতে চান!

হলোও তাই। একটু পরেই বড়দার ঘরের দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। মা আমাকে ইশারায় ভেতরে আসতে বললো। আমি ঢুকলাম। দরজা লেগে গেল। আজকালকার ফ্ল্যাট বাড়ির আড়াইটা বেডরুমের সমান ছিল ছিল বড়দার শোবার ঘর। সেই ঘরের দূরবর্তী কোণে, জানালার পাশে, পড়ার টেবিলে ঘটনা ঘটছে।

মা আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল টেবিলের কাছে। টেবিল ল্যাম্পের হালকা আলোয় দেখলাম মিডিয়ামকে। টেবিলের ওপর কনুই থেকে ভাজ করা এক হাত, হাতের ওপরে মাথা রেখে উবু হয়ে বসে আছেন। চোখ মুখ দেখা যাচ্ছে না। শরীর নিশ্চল। শুধু ডান হাতটা টেবিলের ওপর রাখা কিছু সাদা দিস্তা কাগজের দিকে কলম তাক করে আছে। সেখানে এরইমধ্যে ইংরেজিতে কিছু লেখা হয়ে গেছে। কাসেম মামা পাশেই আরেকটা চেয়ারে শিরদাঁড়া টেনে বসে আছেন। তাকিয়ে আছেন কাগজগুলোর দিকে। এবার সসম্ভ্রমে তিনি কাগজের দিকে তাকিয়েই বললেন, আপনি রোগী দেখতে চেয়েছিলেন, এই যে সে। এবার মিনিটখানেক কেউ কিছু বলছে না। খানিক ভয়, খানিক অস্বস্তি নিয়ে আমি তাকিয়ে ছিলাম মিডিয়ামের মাথার দিকে। পঞ্চাশ বছর আগে মৃত, বৃটিশ আমলের ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের আত্মা এখন আমাকে পরিমাপ করছে? কৈশোরে ডাক্তার দেখানোর এমন অভিজ্ঞতা আমি এখনও কোনো বইতেও পড়িনি।

পরিস্কার মনে নেই, আমার কাশির ধরনটরন নিয়ে মা দু একটা কথা বলেছিল। এমনকি আগে যে সব ডাক্তাররা (জীবিত) আমাকে দেখেছেন, তাদের প্রেসক্রিপশনগুলোও টেবিলে ছড়িয়ে ছিল যেন বিধানচন্দ্র ট্রিটমেন্ট ট্র্যাক করতে পারেন।

বিধানচন্দ্র রায়ের আত্মা সাদা কাগজের ওপর আমার চিকিৎসাবিধান লিখে দিলেন। এরমধ্যে একটি ওষুধ ঢাকাতে পাওয়াই গেল না। পাওয়া গেল কলকাতায়। পিকিউলিয়ার তো বটেই। বিধানচন্দ্র রায় যে কলকাতাতেই প্র্যাকটিস করতেন!

মিরাকল !

ভদ্রলোকের মেডিসিন খেয়ে কয়েকমাসের মধ্যেই আমার কাশি উধাও। সেই কৈশোর থেকে আজ অবধি, নানা কিসিমের হাঁচি-কাশি হলেও, সেই বিশেষ কাশিটা আর কখনও ফিরে আসেনি।

লেখক: অনল রায়হান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জহির রায়হানের ছেলে

 

সর্বশেষ নিউজ