৭ ডিসেম্বর ২০২৫, রোববার

পরিকল্পিত জোড়া খুনকে যেভাবে চালানো হয় সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

ঘটনাটি ২০২১ সালের ১২ আগস্টের। রাত আনুমানিক ১০ টা। নরসিংদী জেলার শিবপুর ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক মো. সাখাওয়া হোসেন ফোর্সসহ টহলে ছিলেন। ওই সময় মাইক্রোবাস ও মটর সাইকেলের সংঘর্ষে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে।

ঘটনাস্থল, নরসিংদীর শিবপুরের কামারটেক। সড়কে পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান নরসিংদীর রায়পুর উপজেলার লোচনপুরের মৃত শামসু হকের ছেলে শাহান শাহ আলম বিপ্লব (৩৪) ও বেলাব উপজেলার বারৈচা গ্রামের মো. তোতা মিয়ার ছেলে মনির হোসেন (৩৪)। তাদের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ৯৮/১০৫ ধারায় নোয়া মাইক্রোবাসের অজ্ঞাতনামা চালককে আসামি করা হয়।

এসআই মো. খাজা মাঈনুদ্দিন তদন্ত শেষে নোয়া মাইক্রোবাসের মালিক মো. মাসুম মিয়াকে আসামি করে শিবপুর মডেল থানায় মামলা করেন। এ মামলায় ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ।

অপরদিকে নিহত বিপ্লবের ভাই সোহাগ মিয়া একই ঘটনায় আদালতে একটি পৃথক সিআর‌ মামলা দায়ের করেন। মামলায় হাইওয়ে পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে আদালত সিআর মামলাটি সংযুক্ত করে নরসিংদীর পিবিআইকে অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

পিবিআইর তদন্ত: বাদীর নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের আদেশে পিবিআই পুলিশ পরিদর্শক মোস্তফা খায়রুল বাশারকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। তিনি বদলী হয়ে চলে যাওয়ায় পরবর্তীতে এসআই মো. আশরাফ আলীকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। মামলার তদন্ত তদারকি করেন পিবিআই নরসিংদীর পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

ঘটনার পেছনের ঘটনা: দুলাল গাজী নামে একজনকে রায়পুরার লোচনপুর বাজারে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করা হয়। এর প্রধান আসামি ছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বিপ্লব। ঘটনাটি বাজারের মধ্যে প্রকাশ্যে সংঘটিত হলেও বিপ্লব ও তার সহযোগীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। বিপ্লবের বিরুদ্ধে ৪টি হত্যাসহ ১০টি মামলা ও ১১টি ওয়ারেন্ট ছিল।

কিন্তু বিপ্লব ধরাছোয়ার বাহিরে ছিল। তার ভয়ে কেউ সাক্ষী দিত না। দুলাল গাজী হত্যার বিপরীতে উক্ত মামলার বাদী রবিন গাজী (দুলাল গাজীর ছেলে) একটি ঘর পুড়ানো মামলায় ৬ মাস জেল খাটে। বাদী হিসেবে মামলা পরিচালনা করতে ভয় পাচ্ছে-এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লব আটক হয়। তাকে গ্রেফতার কাজে সহায়তাকারীদের পরিবারের ২জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তারা হলেন- জুয়েল (২২) ও নাঈম (২৩)।

তবে জনগনকে বলা হয়, ডাকাত পিটিয়ে মেরেছে। যার মামলা চলমান রয়েছে। সিবিআইয়ের এসআই মোহাম্মদ নাসিম পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় বিপ্লবকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করায় এসআই নাসিমের বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগটি নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে তদন্তের জন্য দেয়া হয়। ওই অভিযোগ তদন্তকালীন সময়ে তিনি বর্তমান জোড়া খুন মামলার ঘটনার পূর্বক্ষণে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য যান। শেষ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে মনির হোসেনের মটর সাইকেল যোগে রওনা করেন।

কিছুক্ষণ পরে জানা যায়, বর্তমান মামলার ভিকটিম বিপ্লব ও মনির হোসেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। তাদের মৃত্যুর ঘটনায় হাইওয়ে পুলিশ তদন্ত হলেও পিবিআই নরসিংদী কর্তৃক তদন্ত পর্যবেক্ষনে রাখা হয়।

এছাড়া ছায়া তদন্ত‌ও পরিচালনা করা হয়। পরবর্তীতে বিপ্লবসহ উক্ত জোড়া খুনের মামলা নারাজির ভিত্তিতে নরসিংদীর পিবিআইকে তদন্তভার দেয়া হয়।

যা পেল পিবিআই: মামলাটি পিবিআই নরসিংদী জেলা কর্তৃক তদন্তকালে পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নানের দিক-নির্দেশনায় তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হয়।

পিবিআই কর্তৃক মামলা তদন্তের শুরুতেই নিহত শাহান শাহ আলম বিপ্লবের সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের বিষয়ে যাচাই করা হয়।

ঘটনার পরক্ষণে জনগনের হাতে বিপ্লবের একসময়ের ডিস ব্যবসার পার্টনার আসামি মামুন মিয়া, যিনি বিপ্লবের ডিস ব্যবসার টাকা অনৈতিকভাবে আত্মসাৎ করায় বিপ্লব তার ব্যবসা থেকে বের করে দেয় এবং শত্রুতা তৈরি হয়। তাকে জনগন ধরতে পারলেও দুর্ঘটনার কথা বলে ঘটনাস্থল থেকে জনগনের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলে উক্ত আসামির উপস্থিতি জানতে পেরে বিষয়টি সন্দেহজনক বলে এবং ঘটনায় নিহত দুজন দুর্ঘটনার স্বীকার নন। বরং পরিকল্পিত হত্যার বিষয় হতে পারে মর্মে সন্দেহ করি।

গ্রেফতার করা হয় মো. মাসুমকে। ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত কালো মাইক্রোবাসের মালিক আসামি মো. মাসুম মিয়া কাছাকাছি এলাকায় থাকলেও তিনি তার গাড়ি দেখা ও নেওয়ার জন্য ছুটে আসেননি। যা আরো সন্দেহের সৃষ্টি করে।

সোহাগ গ্রেফতার হলে অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যায়। বিষয়টি হত্যাকান্ড মর্মে নিশ্চিত ধারনা পায় পিআইবি। তার দেয়া তথ্যমতে ঘটনায় জড়িত আসামি সোহাগ মিয়াকে (২০) গ্রেফতার করা হয়। আসামি সোহাগ মিয়া ঘটনার পরিকল্পনা, হত্যার উদ্দেশ্যে অবস্থান নেওয়া, হত্যাকান্ড সংঘটন সংক্রান্তে বিস্তারিত তথ্যসহ ফৌ. কা. বি. ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক টানা ৩ দিন অভিযান শেষে আসামি মো. মাসুদ মিয়াকে কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকা থেকে ছদ্মবেশে কলা বিক্রয়কারী অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। তিনি ১৬৪ ধারায় আদালতে হত্যার পরিকল্পনা, অবস্থান ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জবানবন্দি দেন।

সর্বশেষ এই জোড়া খুনের নেতৃত্ব দানকারী বিপ্লবের কঠিন শত্রু মামুন মিয়াকে একাধিক অভিযান শেষে কৌশলে গ্রেফতার করা হয়। তিনিও ১৬৪ ধারায় আদালতে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জবানবন্দি প্রদান করেন।

আসামিদের দেয়া তথ্যমতে, বিদেশ থেকে জনৈক ওমর ফারুক মোল্লা উক্ত হত্যাকান্ডের জন্য টাকা প্রেরণ করে। তবে উক্ত ওমর ফারুক মোল্লা ঘটনার আগে থেকেই দেশের বাইরে থাকায় তার সংশ্লিষ্টতা ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি যাচাই করে দেখছে পিবিআই।

আসামীদের দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকান্ডের বিবরণঃ গ্রেফতারকৃত সব আসামির দেয়া তথ্যমতে, নিহত বিপ্লবসহ জোড়া খুনের ঘটনায় আসামিদের মুল টার্গেট শাহান শাহ আলম বিপ্লবকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঘটনার এক ছক তৈরি করা হয়। ঘটনার ১৫-২০ দিন আগে আসামি মামুন মিয়ার নেতৃত্বে লোচনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এলাকায় বসে পরিকল্পনা করা হয়। আসামিদের ভাষ্য, বিপ্লব খুব বাড়াবাড়ি করেছে। সে সবার জন্য হুমকির কারণ হয়ে ওঠে। তাই তাকে মেরে ফেলতে হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করায় তার জানাযায় বিপ্লব অংশগ্রহণ করতে পারে মর্মে ধারনা করে আসামিরা। ফলে লোচনপুরের একটি এলাকায় হত্যার প্রস্থুতি নিয়ে সমবেত হয়ে অবস্থান নেয় তারা। কিন্তু অজ্ঞাতবসত বিপ্লব জানাযায় না যাওয়ায় সেদিন আসামিরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর কয়েকদিন পরে বিপ্লব বাড়িতে আসলে পথে তাকে আঘাত করা হবে মর্মে পরিকল্পনা করে অবস্থান গ্রহণ করে।

কিন্তু ওইদিন বিপ্লবের সাথে ৪টি মটর সাইকেল ও ৬/৭ জন লোক থাকায় আসামিরা কোন আক্রমন না করে ফিরে যায়। সর্বশেষ ঘটনার দিনে আসামিরা প্রথমে লোচনপুর থেকে পরিকল্পনা করে বিপ্লবকে হত্যার উদ্দেশ্যে দলবদ্ধভাবে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রসহ নরসিংদী রওনা করে। পথিমধ্যে বারৈচা হতে কালো মাইক্রোবাসটি সংগ্রহ করে। তথ্য সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য মটর সাইকেলে করে সোহাগ ও ফয়সাল নরসিংদীতে আসে। অন্যান্য আসামিরা মাইক্রোবাস যোগে নরসিংদী শহরের ভেলানগর জেলখানা এলাকায় অবস্থান করতে থাকে।

আসামি সোহাগ ও ফয়সাল ভিকটিম বিপ্লবের সার্বক্ষণিক মুভমেন্ট ফলো করে জানাতে থাকে। বিপ্লব ও মনির মটর সাইকেল যোগে হাইওয়েতে উঠলে সোহাগ তাৎক্ষণিক তথ্য জানিয়ে দিলে হত্যার উদ্দেশ্যে অবস্থানরত আসামিরা ভিকটিমদের অনুস্মরণ করতে থাকে। প্রথমে একবার পিছন থেকে আঘাত করে ব্যর্থ হয়ে সামনে গিয়ে আবার অবস্থান করে। বিপ্লবসহ দুজন মটর সাইকেল নিয়ে মামলার ঘটনার স্থলে পৌছা মাত্র কালো মাইক্রোবাসটি দিয়ে পিছন থেকে পরিকল্পিতভাবে ভয়ংকরভাবে ধাক্কা দেয়। জোড়া খুনের ভিকটিম বিপ্লব ও মনির নিহত হয়।

সর্বশেষ নিউজ