১৭ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার

তুরস্কে ৪ বছর আগে নির্মিত অত্যাধুনিক তিনটি ভবন ধ্বসে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে কী পাওয়া গেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 

তুরস্কে নবনির্মিত কয়েকটি অত্যাধুনিক ভবন ধ্বসে পড়লো কেন- আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তার কারণ খুঁজছে। সাধারণত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান দেশের বিদ্যমান আইন মেনেই কাজ করে থাকে।‌ তুলস্কে এটা খুব কড়াকড়ি।

তুরস্কের তিনটি সুউচ্চ বড় ধরনের ভবন বা এপার্টমেন্ট ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ার ঘটনায় আনেকের মাঝে প্রশ্ন এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ভবন দুটি সরকারি নির্দেশনা ও নীতিমালা মেনে ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছিলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রশ্ন হচ্ছে তারা কী মিথ্যা বলেছিল?

৭.৮ এবং ৭.৫ মাত্রার স্কেলে দুই বড় ভূমিকম্পের আঘাতে দক্ষিণ তুরস্ক ও উত্তর সিরিয়ার বহু ভবনকে সমতলে মিশিয়ে দিয়েছে। এমনই তিনটি ভবনের নির্মাণে নিরাপত্তা বিষয়টি অনুসন্ধান করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সমতলে মিশিয়ে যাওয়া ভবনগুলোর মধ্যে অনেক ভবনই রয়েছে যেগুলোর বয়স বেশি দিনের নয়। নবনির্মিণ এসব ভবন তুরস্কের বিল্ডিং কোড অনুয়ায়ী তৈরি হবার কথা। যেখানে ভবনের নিরাপত্তায় সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ভূমিকশ্প সহনীয় কাঠামো।

আধুনিক নির্মাণ কৌশলগুললো অর্থ হল ভবনগুলো উপরের মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে। এবং দেশটিতে আগের সব বিপর্যয়ের পর সরকার ভবনের সুরক্ষায় যেসব নির্মাণ নীতিমালা ঠিক করে দিয়েছিলো সেগুলো ভবন নির্মাণের সময় নিশ্চিত করার কথা ছিলো।

বিবিসির নির্বাচিত এমন তিন নতুন ভবন ধসের প্রথমটির ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে লোকজন চিৎকার করছে এবং নিজেকে বাঁচাতে জন্য দৌড়াচ্ছে। মালতায়ার এই অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের নীচের অর্ধেকটি ভেঙে পড়তে দেখা যায়, বাকি অংশটি ধ্বংসস্তূপের ওপরে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।

অ্যাপার্টমেন্টগুলো গত বছর নির্মিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করা এক বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে ভবনটি ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণের সবশেষ নির্দেশনা মেনে তৈরি করা হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে ভবনটি ওই মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বসে পরার কথা নয়।

বিজ্ঞাপনে আরও আরও দাবি করা হয়েছে, ভরন নির্মানের সব উপকরণ এবংয কারিগর ছিলো ‘প্রথম শ্রেণীর মানের’। যদিও আসল বিজ্ঞাপনটি আর অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না, তবে এই বিজ্ঞাপনের অনেক স্ক্রিনশট এবং ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু বিবিসির অনুসন্ধিন বলছে, ধ্বসে পড়া বেশিরভাড় ভবনই তুর্কি সরকারের নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে, ১৯৯৯ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সরকার ভবন নির্মাণে যেসব কঠিন শর্ত দিয়েছিলো, সেসব সঠিকভাবে না মানার কারণেই ভবনগুলো ধ্বসে গেছে।

২০১৮ সালে তুরস্ক সরকারের সবশেষ বিল্ডিং কোন অনুযায়ী, ভূমিকম্প থেকে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্টিল-কংক্রিটের শক্তিশালী ঢালাই হবার কথা। সেই সঙ্গে ভূমিকম্পের কম্পন শোষণ করার লখ্যে কলাম ও বিমগুলোতে সঠিকভাবে স্থাপন করার কথা। যা খুঁজে পায়নি বিবিসি।

বিভিন্ন ঝবিতে দেখা যাচ্ছে, বন্দর শহর ইস্কেন্ডারুনে নবনির্মিত আরও আরেকটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৬ তলা ভবনটির পাশ এবং পেছনে সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে, ব্লকের একটি স্লিভার দাঁড়িয়ে আছে।

২০১৯ সালে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। অর্থাৎ এটিও ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করার কথা। এই ব্যাপারে কথা বলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছিলো বিবিসি। কিন্ত তাদের তরফ থেকে কোন ধরনের সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিবিসির যাচাই করা আন্তাকিয়ার আরেকটি চিত্র দেখা যাচ্ছে, একটি ৯ তলা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভবনটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেটিও ২০১৯ সালে নির্মিত।

ভবনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, তারা সব নীতিমালা অনুসরণ করেই কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি অংম ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পটি এত বিশাল আকারের ছিলো যে শহরের প্রায় কোনও ভবনই অক্ষত ছিলো না।

দুটি ভূমিকম্পই শক্তিশালী ছিলো, এমন বিষয় মেনে নিয়েই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে ভবনগুলো নির্মাণ করা হলে সেগুলো দাঁড়িয়ে থাকা উচিত ছিলো।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জরুরি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডেভিড আলেকজান্ডার বলেছেন। তাদের মতে ভূমিকম্প শক্তিশালী ছিলো। তবে কম্পন যতক্ষণ স্থায়ী ছিলো, তাতে সুরক্ষিত ভবনগুলো ধ্বসে পড়া কথা ছিলো না।

সর্বশেষ নিউজ