২০ জুলাই ২০২৪, শনিবার

সাংবাদিক আশফাকের বাসার গৃহকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় যত প্রশ্ন

ডেক্স রিপোর্ট
spot_img

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শাজাহান রোডের একটি বাসার নিচতলার গ্যারেজের ওপর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় শিশু গৃহকর্মী প্রীতি উড়ানকে (১৫) উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান বাসার কেয়ারটেকার। ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। ওই ভবনের অষ্টম তলার একটি ফ্ল্যাটে ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হকের বাসা। ঘটনার পরে বাসার সবাইকে আটক করা হলেও ১২ ঘণ্টারও পরে এজাহার প্রস্তুত করে আশফাক দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়। বুধবার আদালতে হাজির করা হলে আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। ঘটনার সময় থেকে এখন পর্যন্ত এই মৃত্যুকে ঘিরে যত প্রশ্ন তার জবাব মেলে না। মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলা যে ধারায় হয়েছে সেটি সঠিক না। এবং অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

ছয় মাস আগেও সাত বছরের এক শিশু গৃহকর্মী বাসা থেকে লাফ দিয়েছিল। রক্তাক্ত জখম হলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় ফেরদৌসি নামের সেই শিশুটি। সে ঘটনায় মামলাও হয়েছিল। ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই আবারও এক শিশু গৃহকর্মী একই বাসা থেকে লাফ দেয়। এবার আর ভাগ্য সহায় হয়নি। আট তলা থেকে লাফ দিয়ে এক তলার গ্যারেজের ছাদের ওপর পড়ে ১৫ বছর বয়সী প্রীতি উড়ান। হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রশ্ন হলো ছয় মাস আগে যে বারান্দা থেকে একজন পড়ে গেল, সেই বারান্দায় গ্রিল লাগানোর প্রয়োজন আশফাক বোধ করেছিলেন কিনা। আগের ঘটনার পরে আবারও পুনরাবৃত্তি হয় যদি একই ঘটনার এবং কারোর মৃত্যুর কারণ হয় তারপরেও কীভাবে সেটা কেবল অবহেলা হয়ে থাকে।

প্রীতি উড়ানের বাবার অভিযোগ, অভাবের কারণে দুই বছর আগে মিন্টু নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে সাংবাদিক আশফাকুল হকের বাসায় ছোট মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আশফাকুল হকের পরিবার দুই বছরেও মেয়েকে তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে দেয়নি। মাসে দুই-একবার গৃহকর্তার মোবাইলে যোগাযোগ করে কথা বলিয়ে দিতো তারা। প্রশ্ন উঠছে, সচেতন সাংবাদিক তার বাসায় শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োগ দিতে পারে কিনা।

২০২২ সালে ‘আইএলও কনভেনশন-১৩৮’ অনুসমর্থনের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়৷বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ওই সনদে শিশুশ্রমের ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত শর্তগুলো তুলে ধরেন সাংবাদিকদের কাছে। তিনি বলেন, ‘‘এখানে তিনটা জিনিস আছে। একটা হলো জেনারেল ভিউটা, যেহেতু বেসিক এডুকেশন করতে ১৫ বছর লাগে সুতরাং ১৫ বছরের কম কোনো বাচ্চাকে কাজে লাগানো যাবে না। ‘দুই নম্বরে আরেকটু রিল্যাক্স করেছে, তবে কোনো দেশের যদি আর্থসামাজিক অবস্থা বিশেষ বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা কমাতে চায় তাহলে ১৪ বছর পর্যন্ত কমানো যাবে, এর ওপর না। ‘তিন নম্বরে বলেছে, এই যে ১৪ হোক বা ১৫ই হোক এই শিশুদের কোনো অবস্থায়ই কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না।’ সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেসব কাজে তাদের এক্সিডেন্ট হওয়ার বা জীবন নাশের সম্ভাবনা আছে সেই সব কাজে কোনোভাবেই এই সব শিশুদেরকে ব্যবহার করা যাবে না।’

এদিকে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়। ওই বাসায় কেউ না কেউ গৃহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করতেন বলে তারা ধারণা করছেন। এ কারণে গৃহকর্মীরা বাসায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। বাসা থেকে পালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি মাহফুজুল হক ভূঁইয়া বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সৈয়দ আশফাকুল হক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকার গৃহকর্মীর নিচে পড়া সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করার চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, প্রীতিকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে এর বিচার চেয়েছে পরিবার ও এলাকাবাসী। এ উপলক্ষে শনিবার সকালে মিরতিংগা চা-বাগানে শ্রমিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন রহিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল, মিরতিংগা চা-বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি মন্টু অলমিক প্রমুখ। মানববন্ধনে বক্তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানান। মানববন্ধনে চা-বাগানের শ্রমিকসহ স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সর্বশেষ নিউজ