দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-এর শীর্ষ প্রশাসনে এক নজিরবিহীন নাটকীয় পটপরিবর্তন ও বড় ধরনের ধস নেমেছে। তীব্র গ্রাহক বিক্ষোভ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে নীতিগত বিরোধের জেরে অবশেষে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ করার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাঁর অফিশিয়াল পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
আজ রবিবার (২৪ মে ২০২৬) সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে এই মেগা ব্রেকিং খবরটি সামনে আসে। একই সাথে ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানও পরিচালনা পর্ষদের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে ব্যাংকটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সাথে বিরোধ ও দেড় মাসের ছুটি
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে জানা যায়, দেশে নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর এবং মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে যোগদান করার পর থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক ধরণের দূরত্ব তৈরি হয়। ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডির তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
এই টানাপোড়েনের মাঝেই গত ১২ এপ্রিল ব্যাংকের বোর্ড সভায় এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান অনলাইন মিটিংয়ে যুক্ত থাকার শর্তে দেড় মাসের দীর্ঘ ছুটি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। একই সময়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকেও এক প্রকার জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো হয়।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক বিপর্যয় ও শীর্ষ পদের খতিয়ান:
| সূচক ও বিবরণের খাত | ২০১৬ সালের আর্থিক চিত্র (এস আলম পূর্ববর্তী) | ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান আর্থিক চিত্র | বর্তমান সাংগঠনিক ও আইনি অবস্থা |
| বার্ষিক নীট মুনাফা | প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। | মাত্র ১৩৭ কোটি টাকায় ধস। | চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান আজ পদত্যাগ করেছেন। |
| খেলাপি ঋণের অনুপাত | মাত্র ৪.২৫ শতাংশ। | ৪৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। | এমডি ওমর ফারুক খানও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। |
| মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ | সহনীয় মাত্রায় ছিল। | ৯২,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। | এস আলমের বেনামী ৮২% শেয়ার জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। |
| বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার | প্রায় ৬৩ শতাংশ। | কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭.৯১ শতাংশে (মার্চ ২০২৬)। | আজ অনুষ্ঠিতব্য বোর্ড মিটিং সাধারণের বিক্ষোভে বাতিল। |
প্রধান কার্যালয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ, বাতিল হলো বোর্ড মিটিং
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ রবিবার মতিঝিলস্থ ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে (Head Office) ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক এবং কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন।
বিক্ষোভকারীরা ছুটিতে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানের সমর্থনে স্লোগান দিতে থাকেন এবং তাঁকে যেন কোনোভাবেই পদত্যাগ করতে বাধ্য না করা হয়, সেই দাবি তোলেন। একই সাথে তারা ব্যাংকটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেন। উদ্ভূত চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে বোর্ড মিটিংটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয় এবং অবরুদ্ধ অবস্থার মুখে চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিকট পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে, এমডি ওমর ফারুক খানও বোর্ডের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলেও মিটিং বাতিল হওয়ায় সেটির ওপর এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এস আলমের লুটপাট: ৪.২৫% থেকে খেলাপি ঋণ এখন ৪৯%
ব্যাংকটির বার্ষিক ও সর্বশেষ মার্চ ২০২৬-এর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এক ভয়ংকর ও লোমহর্ষক লুটের খতিয়ান সামনে এসেছে। ২০১৭ সালে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিতর্কিত শিল্প গোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’ জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন গভর্নর অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরের আমলে এস আলমের বোর্ড ভেঙে দিয়ে অধ্যাপক জুবায়দুর রহমানকে স্বাধীন পরিচালক ও পরবর্তীতে চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে ব্যাংকটির মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যেখানে ইসলামী ব্যাংকের বাৎসরিক নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫ সাল শেষে তা তলানিতে নেমে মাত্র ১৩৭ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র মিলেছে খেলাপি ঋণে (Default Loan)। ২০১৬ সালে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল মাত্র ৪.২৫ শতাংশ, যা বর্তমানে অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে! অর্থাৎ ব্যাংকের দেওয়া মোট ঋণের অর্ধেকই এখন জ্যান্ত খেলাপি। টাকার অংকে যার পরিমাণ ৯২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ধুলিসাৎ হয়েছে। যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানার হার এক সময়কার ৬৩ শতাংশ থেকে কমে চলতি বছরের মার্চে মাত্র ১৭.৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, এস আলম গ্রুপের বেনামে থাকা প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত ও ফ্রিজ করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজকের এই শীর্ষ দুই কর্মকর্তার পদত্যাগের ফলে দেশের বৃহত্তম এই শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সাধারণ আমানতকারীরা।

