মৌলভীবাজার জুড়ীর সংরক্ষিত বনের লাঠিটিলা বিটের সেগুন গাছ রক্ষার দায়িত্ব যে কর্মকর্তার, খোদ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে গাছ লুটেরাদের সঙ্গে হাত মেলানোর। ওই বিটের সেগুন গাছ চোরচক্রের হাতে উজাড় হলেও তা ধামাচাপা দিয়ে আসছেন বন কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম। এমনকি চোরচক্রের খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এক কলেজছাত্রকে মামলা দিয়ে ১৫ দিন জেল খাটিয়েছেন তিনি। আর চোরচক্র এখনো অধরা, এখনো তারা লুটে নিচ্ছে সংরক্ষিত এ বনের সেগুন গাছগুলো। রিং পদ্ধতিতে মারা হচ্ছে এখানকার বৃক্ষ, যা নিয়ে কোনো উদ্বেগই নেই এই রেঞ্জের বন কর্মকর্তাদের।
বনের গাছ চুরি ধামাচাপা দেওয়া এবং পরকিল্পিতভাবে শায়েস্তা করতে এক প্রতিবাদী কলেজছাত্রকে মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে ঢুকানোর অভিযোগ বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে লিখিত জানানো হলেও কিছুই হয়নি। শুধু ‘ভুল’ হয়েছে বলেই দায় শেষ করেছেন তিনি। একইভাবে দায় শেষ হয়েছে এই সাজানো মামলার নাটের গুরু বিট কর্মকর্তা মাজহারুলেরও।
গাছ চুরির তথ্য আইন অনুযায়ী উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের না জানানোর দায়ে তাকে কারণ দর্শাতে হয়নি, শুরু হয়নি কোনো তদন্ত। বিভাগীয় শাস্তির মুখেও পড়তে হয়নি। এ অবস্থায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন চুপচাপ থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওই এলাকায়।
ঘটনার শুরু কোরবানির ঈদের আগের দিন গত ১৬ জুন। সংশ্লিষ্ট বিট এলাকা থেকে চুরি হয় অন্তত ১৫টি সেগুন গাছ। তবে দেখেও চেপে যান বন কর্মকর্তা মাজহারুল, যার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গাছ চোর বা লুটেরাচক্রের সঙ্গে একজোট হয়ে বন উজাড়ের অভিযোগ আছে।
তবে সবাই চেপে গেলেও স্থানীয় লালছড়া গ্রামের ভিলেজার আসুক মিয়ার ছেলে প্রতিবাদী কলেজছাত্র ছনির হোসেন (২০) ঘটনা ফাঁস করে দেন স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে। এ খবর পেয়েই ওই ছাত্রকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেন বনকর্মকর্তা। গাছচুরির প্রতিবাদকারী স্থানীয় শিলুয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের
দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছনির হোসেনকে বানানো হয় গাছ চোর, দেওয়া হয় মামলা। কোরবানির ঈদের আগের দিন জেলে পাঠানো হয় ছনিরকে।
ছনিরকে যখন বিট অফিসে নিয়ে কেন সাংবাদিকদের গাছ চুরি হওয়ার কথা জানানো হলো- প্রশ্ন করে স্থানীয়দের সামনে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখনও মাজহারুল ইসলামের কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে স্থানীয় সাংবাদিকেরাও জানিয়েছিলেন, কিন্তু তারা সঠিক সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে রহস্যজনক কারণে বিরত ছিলেন। গাছ চুরির তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার অপরাধে বন কর্মকর্তা মাজহারুলকে জবাবদিহি করতে বলেননি বেং নির্দোষ কলেজছাত্রকে ছেড়ে দেওয়ারও ব্যবস্থা করেননি উর্ধ্বতন ওই বন কর্মকর্তারা।
স্থানীয়রা এসব তথ্য জানিয়ে এইদিন এইসময়কে বলেন, সেই থেকে এ ঘটনা নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। নির্দোষ ছেলেটি প্রতিবাদ করেছে রাষ্ট্রের গাছ রক্ষায়, আর তাকেই সরকারের নিযুক্ত কর্মকর্তারা জেলে পাঠালেন- যাদের বেতন ভাতা এই সাধারণ মানুষের টাকায়ই হয়, এ বিষয়টি স্থানীয় লোকজন মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। কিন্তু তারা নীরব থাকায় স্থানীয়রা অসহায় হয়ে পড়েন।
জানা গেছে, এ মামলায় ১৫ দিন জেল খেটে ছনির জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
কোনো তদন্ত আসলে যাতে গাছ চুরি হয়নি মর্মে সাক্ষ্য দেয় ওই কলেজছাত্র- সে বিষয়ে রীতিমতো শাসানো হচ্ছে গাছ চোরচক্রের প্রভাবশালী হোতাদের মাধ্যমে। আদালত বা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে বনকর্মকর্তার কথামতো ভাষ্য না দিলে এ মামলা থেকে ছনিরকে বাদ দেওয়া হবে না এবং সারাজীবন জেলে পঁচতে হবে বলেও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বন কর্মকর্তা মাজহারুল।
এ মামলায় ছনিরের সঙ্গে আরও দুজনকে আসামি করা হয়। তারা হলেন- একই এলাকার মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুল (২৮) ও লোকমান মিয়ার ছেলে বদর মিয়া (৩৮)।
তবে মামলা করে বেশি দুর গড়াতে পারেনি এই বন কর্মকর্তা। মামলার সাক্ষীরা আদালতে ছনিরকে নির্দোষ বলে সাক্ষ্য দিলে ১৫ দিন পর ছনিরের জামিন হয়। কিন্তু এই টগবগে যুবকের জীবনের ১৫টি দিন কেন কারাগারের অন্ধকারে কাটলো, কেন তার জীবনে জেলখাটার দাগ লাগলো, কেন তার রাষ্ট্রের পক্ষের জনস্বার্থে করা প্রতিবাদের এমন ফল দিলেন সরকারি কর্মকর্তারা, এর দায় কে নেবে- এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও উত্তর মিলছে না।
তবে ঢাকার বন ভবনের কর্মকর্তারা বলেছেন, মাজহারুল এ ঘটনা ঘটালে তা চাকরির বা সরকারি নির্দেশের বিরোধী। যা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার অন্তত ৫জন ব্যক্তি এইদিন এইসময়কে মোবাইলফোনে বলেন, ‘বিভাগীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এসব জানেন। না হলে নির্দোষ এক কলেজছাত্র গাছ চুরির খবর প্রকাশ করে দেওয়ায় তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ১৫ দিন জেল খাটানো হলো। কত নির্যাতন করা হলো। যে অভিযোগ পৌঁছানো হয় বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছেও। কিন্তু কিছু হলো না। নির্দোষ কলেজছাত্র এখনো ওই মামলার আসামীই রয়ে গেল। আর বহাল রইলেন দোষী বন কর্মকর্তা মাজহারুল। এসব কারণেই উজাড় হয়ে যাচ্ছে বন। এগুলো বন কর্মকর্তাদের পেটেই যাচ্ছে। তারা লালনপালন করছে গাছ চোরচক্র। নইলে গাছ লুট বা চুরি সম্ভব না।’
জানা গেছে, জেল থেকে বেরিয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কলেজ ছাত্র ছনির হোসেন। প্রতিকার ও সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছেন।
কলেজ ছাত্র ছনির হোসেনের অভিযোগ, ‘এই গাছগুলো সরকারের সম্পত্তি। আমি একজন ভিলেজারের (বন জাগিদার) সন্তান হিসেবে এই বনরক্ষা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমি বন বিভাগকে গাছ চুরির তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি। বিট কর্মকর্তা মাজহারুল চোরের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমার নামে মামলা দিয়েছেন। এই মামলার জন্য ঈদের আগের দিন থেকে আমি ১৫ দিন জেলে ছিলাম। আমি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই এবং প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে লাঠিটিলা বনের গলাচিপা ও দশেরটিলা থেকে ১৫টির বেশি সেগুনগাছ চুরি হয়েছে। এ ছাড়াও ১৫ থেকে ২০টি সেগুন গাছ রিং পদ্ধতিতে মারা হয়েছে। এই বিষয়টি লাঠিটিলা বিট কর্মকর্তা অবগত হওয়ার পরে বিষয়টি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে সমাধান করেন। ১৫টিরও বেশি গাছ চুরির ঘটনায় বন বিভাগ অপরাধীদের আইনের আওতায় নেওয়ার কথা থাকলেও বিষয়টি অজ্ঞাত রয়ে যায়। এক মাস পেরিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে এছ। তৎকালীন সময়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে বা আইনিভাবে জানাননি বন কর্মকর্তা মাজহারুল।
গাছ চুরি হওয়ার বিষয়টি অবহিত করা হয়নি স্বীকার করে জুড়ী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইন।
এই মামলায় সাক্ষী ফরেস্ট গার্ড আব্দুস সাকুর বলেন, ‘ছনির হোসেন গাছ চুরির সঙ্গে জড়িত নয়। যারা প্রকৃত চোর তারা মামলা থেকে বাদ পড়েছেন।
মামলার অপর সাক্ষী আব্দুস শুক্কুর জানান, ‘এই মামলায় কেন তাকে জড়িত করা হয়েছে আমি জানি না। বন বিট অফিসার মাজহারুল ইসলাম আমাদের বস। তিনি যাকে মামলা দিবেন বাধ্যতামূলক সেই মামলায় আমাদের স্বাক্ষর করতে হয়।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে বন কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম এইদিন এইসময়কে বলেন, ‘এলাকার কিছু মানুষের কাছ থেকে তার (ছনির হোসেন) নাম নিয়ে তদন্ত করে মামলা দিয়েছি। সে হয়ত কম জড়িত ছিল। মামলা যেহেতু হয়ে গেছে। ওই ছেলেকে (কলেজছাত্র ছনির) এখন কীভাবে সাহায্য করা যায় এই ব্যাপারে বুদ্ধি দেন।’
মামলার সাক্ষীরা অস্বীকার করছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারা তো আমার স্টাফ। তারা কি কোর্টে বা আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে বলবে যে আমার কথায় স্বাক্ষর করেছে।’
এ বিষয়ে বন বিভাগের জুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইন এইদিন এইসময়কে বলেন, ‘ছনির হোসেন নামে যে ছেলেটাকে আসামি করা হয়েছে, সে আমার অফিসে এসেছিল। বিষয়টি আগে জানলে মামলা কোর্টে পাঠানোর পূর্বে তার নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল। এখন আর সুযোগ নেই। সে গাছ চুরির তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে। এটা ভালো কাজ করেছে। এ জন্য তাকে মামলা দেওয়া ঠিক হয়নি। লাঠিটিলা বিট কর্মকর্তাকে আমি অফিসে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন ছেলেটাকে মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এটা ভুলে হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির এইদিন এইসময়কে বলেন, ‘এমনটি হলে এটি একটি অমানবিক এবং অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়। ছেলেটা মিথ্যা মামলায় জেল খেটেছে। এটা তো ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। একজন নিরপরাধ মানুষকে তো সাজা দিতে পারে না। তদন্ত করে সে নির্দোষ হলে তাকে মামলা থেকে কীভাবে অব্যাহতি দেওয়া যায় বিষয়টি বিবেচনা করব।’
বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে বন কর্মকর্তারা স্বীকার করলেও তারা ছনির হোসেনকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেননি। বহাল তবিয়তেই আছেন বিট কর্মকর্তা মাজহারুল ও তার মদদপুষ্ট চিহ্নিত গাছ লুটেরারা।
বন কর্মকর্তাদের এ কেমন ভুল! কলেজছাত্রের জেল খাটার দায় কে নিবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, এইদিন এইসময়

