ফোনের এক প্রান্ত থেকে মেয়ে বলছে ‘আব্বু তুমি কান্না করছো যে…’ ঠিক এমন সময় ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে শোনা যায় গুলির শব্দ ও সঙ্গে একজনের গোঙানির আওয়াজ। বলছি টেকনাফ পৌরসভা কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যার সময় ফাঁস হওয়া অডিওর কথা।
২০১৮ সালে তৎকালীন সরকার মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালায়, যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে বন্দুকযুদ্ধে ১০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন নিহত হয়। ২০১৮ সাল থেকে শুধুমাত্র টেকনাফেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিচারবহির্ভূত গুলাগুলিতে ২০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। তাদের একজন কাউন্সিলর একরামুল।পরপর তিনবার টেকনাফ পৌরসভা কাউন্সিলর ছিলেন একরামুল হক।
তার ঘটনাটি সেই সময়ে আলোচিত হওয়ার প্রধান কারণ, তাকে হত্যার আগ মুহূর্তের একটি অডিও ফাঁস হয়ে যায়। যেখানে একরামুলকে শেষবারের মতো মুঠোফোনে তার স্ত্রী ও মেয়ের সাথে কথোপকথনে শোনা যায়! ‘আব্বু তুমি কান্না করছো যে…’- বাবা একরামুলের উদ্দেশে মেয়ের বলা এমন আকুল কণ্ঠস্বরটি সংবেদনশীল মানুষকে নাড়িয়ে দেয়! দর্শকদের একটি বড় অংশ সেই ঘটনার ছায়া খুঁজে পেয়েছে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়েব ফিল্ম ‘আমলনামা’য়।
অয়েব ফিল্ম আমলনামা পরিচালক)রায়হান রাফির বানানো একটি কাল্পনিক মুভি। এই মুভিতে রায়হান রাফি নিজেই প্রথমে স্বীকার করেন যে, মুভিটি কোন সত্যি ঘটনার সাথে মিল নেই, তিনি তার মন মত করে কাল্পনিকভাবে এই মুভিটি বানিয়েছেন।
তারপরও একরামুল হকের ঘটনাকে নিয়ে আমলনামা অয়েব সিরিজ বানানো হয়েছে বলা
প্রথম আলোর প্রচার করার বিষয়টি খুবই অপমানজনক এমন্টাই বলছিলেন একরামুলের স্ত্রী আয়েশা।
আয়েশা তার ক্ষুব্ধ মত প্রকাশ করে বলেন আর আপনারা আজ এই মুভি দেখে আমাদেরকে দোষারোপ ও লজ্জিত করছেন।
আপনারা এই মুভিটা আমার স্বামীর ঘটনা বলে অপপ্রচার করতেছেন, আমার স্বামী কোন প্রকার মাদকদ্রব্যের সাথে জড়িত ছিল না। আমার স্বামীকে খুনিরা পরিকল্পিতভাবে এবং নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আজ আপনারা এই মুভি দেখে আমার স্বামীর আসল ঘটনা বলে উল্লেখ্য করিতেছেন।
আয়েশা বলেন রায়হান রাফি যদি বলেন এই অয়েব ফিল্মটি একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে তাহলে আইনানুগ ভাবে তার বিরুদ্ধে মানহানীর মামলা করতে বাধ্য হব।
এই সিনেমায় দেখানো হয় হত্যা করে ফেলা মানুষটি পূর্বে থেকেই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। যে কারণে একরামুলের স্ত্রী এই বিষিয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন।
আয়েশা বলেন, আর আমি রায়হান রাফিকে বলবো “এই মুভিটি একরামুল হকের আসল ঘটনার সাথে কোন মিল নেই” এই কথাটা সবার সামনে বলার জন্য অনুরোধ করছি।
অন্যদিকে প্রথম আলোর এই ঘটনাকে একরামুল হকের আসল ঘটনা বলে প্রচার করার বিষয়টি নিয়ে আয়েশা বলেন, এই মুহূর্তে আমাকে ও আমার দুই মেয়েকে জাতির সামনে অপমান, লজ্জিত ও দোষারোপ করতেছেন।
আর পুরো জাতি জানে আমার স্বামী কোনরকম মাদকদ্রব্য ও অন্যায় কাজের সাথে জড়িত ছিলেন না। সে আজ মাদকের বিরোধিতা করেছিল তাই খুনিরা আমার স্বামীকে অন্যায়ভাবে ও নাটকীয়ভাবে হত্যা করে।
তিন আরও বলেন প্রথম আলো যে বিষয়টি ভুল করে প্রচার করেছে অর্থাৎ তা ভুলবশত করেছেন,তারা তা স্বীকার না করে তাহলে আমি ও আমার দুই মেয়ে মিলে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করতে বাধ্য হব।
আর আমি প্রথম আলোকে অনুরোধ করছি যে, অতিশীঘ্রই এই ঘটনাটি “একরামুল হকের ঘটনার সাথে কোন মিল নেই” এই কথাটি সবার সামনে বলার জন্য।
উল্লেখ্য কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত একরাম যে প্রকৃত অপরাধী ছিলেন না, তা খোদ র্যাবের প্রতিবেদন থেকেই বোঝা যায়। তারা একরামের পরিচয় উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিল, ‘একরামুল হক কমিশনার (৪৬), পিতা–মোজাহার মিয়া, নাজিরপাড়া, টেকনাফ পৌরসভা, টেকনাফ।’ পরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, একরামুলের বাবার নাম মোজাহার মিয়া নয়, তাঁর ঠিকানাও নাজিরপাড়া নয়। বরং এনামুল হক নামের অন্য একজন তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীর বাবার নাম মোজাহার মিয়া ও ঠিকানা নাজিরপাড়া।
একরামুলের মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনার সময় একজন বিগত সরকারের একজন মন্ত্রী বলেছিলেন, এ রকম অভিযানপরিচালনার সময় একটি–দুটি অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে যেতে পারে।

