গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাজমুল  আইনের ফাঁদে ফেলে কেড়ে নেন মতিউরের ইউটিউব চ্যানেল

ফারহানা সুমনা
spot_img
spot_img

মতিউর রহমান। পেশায় একজন ইউটিউবার। তবে পরিচিত  কোনো মুখ নন কারণ ক্যামেরার সামনে নয় পেছনেই কাজ করেন তরুণ এই ইউটিউবার।নওগা জেলার নিয়ামতপুর থানার অজপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মতিউর। শুরুটা ২০১৭ সালে। বেকারত্ব যখন মতিউর এবং তার পরিবারকে ঘিরে ধরেছিল নিঃশেষ করে দিচ্ছিল

মানুষগুলোকে আস্তে আস্তে ঠিক তখনই কনটেন্ট ক্রিয়েটিং বা ভিডিও বানানোর কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেন মতিউর।

মতিউর ইউটিউবে তার প্রথম ইনকাম নিয়ে বলেন,প্রথম ইনকাম ছিল  ১০০ডলার। তো আমি আমার বাবাকে বললাম আমি ইনকাম করেছি চল টাকা উঠাতে যাব। তখন  আমার বাবা প্রথমে বিশ্বাস করেনি তো আমার মা বলল যেই এই টাকা আসলে কিরকম? আমাকে একটু নিয়ে আসা দেখাইসতো।

যেন স্মৃতির সেই সোনালী অতীতে ফিরে গিয়েছিল মতিউর, সে বলল  হাস্যকর  অনেক ইতিহাস আছে।পরবর্তীতে আমি আমার বাবাকে নিয়ে গেলাম। আমার প্রথম টাকা উঠে আমার বাবার হাতে দিলাম।১০০ ডলার ছিল প্রায় তখন ৯০০০ টাকার মত।

সে সময় মজাদার সব ভিডিও বানিয়ে মতিউর তার ছয়টি ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করেন। সব মিলিয়ে ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় 2 কোটি। বাংলাদেশে YouTube কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে এটি একটি অন্যতম মাইলফলক।

ইউটিউব চ্যানেল খোলার কারণ হিসেবে মতিউর জানান,আসলে  ঢুকছি যদি পাঁচ থেকে 7 হাজার টাকা ইনকাম করা যাইতো। আমার ফ্যামিলির সাপ্তাহিক যে হাট বাজার করতে হয় এটার টাকাটা যদি আমি পাইতাম এটার উদ্দেশ্যে আমি এই কাজে  ঢুকছি। মতিউর জানান YouTube এ কাজ করতে ঢুকছি কিন্তু আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে আমি এতগুলা মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব, ইউটিউবিং করে।

এই প্ল্যাটফর্ম ব্যাবহার করে *মতিউর নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন সাথে পরিবারেরও হাল ধরেছেন তার। এই কাজের মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রামের শতাধিক মানুষের।মতিউরের টিমে যারা কাজ করেন তাদের বিশ্রাম এবং থাকার জায়গাও তৈরি করা হয়েছে। এক শিফট কাজ শেষে দলের লোকজন যখন দুপুরের খাবার খায় তখন  দেখে মনে হয় এ এক বিশাল কর্মযোগ্য।

তবে মতিউরের এই সুখ বেশিদিন টেকেনি।
অজোপাড়া গায়ের ছেলেটি যখন যশ খ্যাতির চূড়ায় সাথে অর্থবিত্তে বলিয়ান ঠিক তখনই তার উপর কুনজর পড়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাজমুলের।

২০২০ সালে মতিউরকে  ডিবি থেকে  নক করা হয়। ডিবি অফিস থেকে বলা হয়   তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। তুমি আমাদের সাথে আইসা দেখা করো। মতিউর কবে আসবো জিজ্ঞেস করলে,  ডিবি অফিস থেকে জানানো হয় যে কালদিন পরে অবশ্যই তোমাকে আসতে হবে। তুমি যদি না আসো তাহলে আমি তোমার উপরে মামলা করে দিব। মতিউরের শ্রমঘামে আয় করা বৈদেশিক মুদ্রায় নজর দিয়ে ক্ষান্ত হননি নাজমুল। অনৈতিক চাওয়া পূরণ না করায় দুটি মামলা করা হয় মতিউর এর বিরুদ্ধে।

পরে মতিউর কে  গ্রেফতার করেন গোয়েন্দা পুলিশ। আটক অবস্থায় তার কাছ থেকে সর্বাধিক ফলোয়ার সমৃদ্ধ মাহাফান টিভি ইউটিউব চ্যানেলটিও হাতিয়ে নেয় এডিসি নাজমুল।

একটা  মামলা করা হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরেকটা মামলা করা হয় পর্নোগ্রাফি আইনে। সেই থেকে মতিউরের মাহা ফান টিভি গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাজমুলের দখলে। সেখান থেকে টাকাও তুলছেন নিয়মিতভাবে নাজমুল।  তার উপর চ্যানেল সচল রাখতে মতিউরেরই এক সহকর্মীকে জোরপূর্বক কাজে লাগান।

মতিউর জানান জেল থেকে সাতদিন পর পর বাসায় কথা বলা যেত।মতিউর বাসায় কথা বলেন  বাবাকে বলেন দেখো ব্যাংকে খুঁজ নাও,আমার তো টাকা ঢুকে যাওয়ার কথা। টাকাটা ঢুকছে কিনা?তো বাবা মা বলেনযে তোমার টাকা ঢুকে নি।

জেল থেকে আসার পরে  আর ঢাকাতে দেরি করেননি মতিউর,  আবার যদি জেলে ঢুকিয়ে দেয় সেই ভয়ে।সঙ্গে সঙ্গে বাসায় চলে আসেন মতিউর। ফিরে এসে এডিসি নাজমুলকে বলেন ,  স্যার যা হবার হইছে আমি তো জানি যে আপনি আমার
টাকাগুো নিয়ে নিছেন।  আমার চ্যানেলগুলা আপনি ব্যাক দেন আমাকে। তো উনি বললেন যে ঠিক আছে কয়েকটা দিন পরে আমি চ্যানেল ব্যাক দিব।

মতিউর জানান  তার সবচাইতে বড় চ্যানেল যে চ্যানেলটি সে একে একে সাবস্ক্রাইব করে করে বড় করেছিলেন এডিসি নাজমুল   ওই চ্যানেলটা রেখে দেন।উনি এক মাসের পুরো টাকা আমার ট্রান্সফার করে নেন। সেটা কত টাকা হবে প্রশ্ন করে জানা যায় প্রায় ৬৫লাখ টাকা।

মতিউর আক্ষেপ করে বলেন এটা তো কেমন বেশি অন্যায় হয়ে গেল। এমনিতেই তো জেলে পাঠাইছে অন্যায় হইছে হইছে। এটা অতিরিক্ত অন্যায় করা হয়ে গেল আমার সাথে। সে আমাকে জেলে পাঠাইতে পারে। কিন্তু  আমার তো টাকা নেওয়ার তার কোন অধিকার নাই, আমার কাছ থেকে। উনি চ্যানেল দিবেন না। উনি বলছেন যে তোমাকে বাকি চ্যানেল দিলাম এই চ্যানেল আমি রাখব। চাইলে তো চ্যানেল নিয়ে নিতে পারব। বন্ধ করে দিতে পারব। এখন চ্যানেল নিয়ে নিই আর যদি বন্ধ করি তাহলে তো উনি আমার উপর আবার একশন নিবেন।

বর্তমানে ওই চ্যানেলে কত টাকা ইনকাম হচ্ছে কত টাকা ট্রানজেকশন হচ্ছে জানতে চাইলে মতিউর বলেন,চ্যানেল যেহেতু উনার হাতে। ওই চ্যানেলে কত টাকা ইনকাম হচ্ছে আর কত টাকা ট্রানজেকশন হচ্ছে এটা আমি বলতে পারবো না।

এদিকে মতিউরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই করেও এর সত্যতা মেলে। সত্যতা পাওয়া যায় গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাজমুলের সাথে মতিউরের ধারাবাহিক কথোপকথনেও।

উল্লেখ্য ডিবির বিতর্কিত এ গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী শাসনামলে বিএনপি, জামায়াতসহ বিরুদ্ধমত দমনে সক্রিয় ছিলেন। সাইবার ক্রাইমের এডিসি থাকাকালে আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে কেউ পোস্ট দিলে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা করলে—তাকে ধরে এনে মামলা, নির্যাতন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে পোস্ট মুছে ফেলতে বাধ্য করতেন।

সর্বশেষ নিউজ