ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম যে ভোট পেয়েছেন, এই পদে বাকি প্রার্থীরা মিলেও এই ভোট পাননি। অর্থাৎ সবার ভোট একসাথে যোগ করলেও সাদিককে হারানো সম্ভব নয়। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে এস এম ফরহাদ যে ভোট পেয়েছেন তাঁর দুই নিকটতম প্রার্থী ছাত্রদল ও বাম সমর্থিত প্রার্থীরা মিলেও তাকে হারাতে পারতেন না। সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে নিকটতম চার প্রার্থীর ভোট যোগ করেও মুহা. মহিউদ্দীন খানের প্রাপ্ত ভোটের সমান হয় না।
ডাকসুতে পদ আছে ২৮টি। এর মধ্যে ১২টি সম্পাদকীয় ও ১৩টি সদস্যপদ। ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সহ ৯টিতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি তিনটি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এছাড়া ১৩টি সদস্য পদের মধ্যে ১১টিতে জয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্যানেলের সদস্যরা। একটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। অন্যটিতে জয়ী বাম-সমর্থিত প্রার্থী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১০৪ বছর আগে, ১৯২১ সালে। আর বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম ভোট হয় ১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে। সেই থেকে ১০০ বছরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩৭ বার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৪ বছরে নির্বাচন হয়েছে সবচেয়ে কম, মাত্র সাতবার।
ডাকসু নির্বাচনে এবারই প্রথম স্বামী-স্ত্রী একই প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছেন। এর আগে কোনো নির্বাচনে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে প্রার্থী হওয়ার নজির নেই। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এই দম্পতি ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। নির্বাচনে উম্মে ছালমা কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে এবং তাঁর স্বামী রায়হান উদ্দিন সদস্যপদে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনপুষ্ট ছাত্রশিবির ডাকসু নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে ফাতেমা তাসনিম জুমাকে প্রার্থী ঘোষণা করে। একে তো ছাত্রশিবির এ পদে নির্বাচন করছে, অপরদিকে এই নারী শিক্ষার্থী হিজাব পরিধান করেন না। এসব নিয়ে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন জুমা। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, জুমাকেই বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন শিক্ষার্থীরা। ভিপি পদে সাদিক কায়েমকে বাদ দিলে জুমা একমাত্র প্রার্থী যিনি সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়েছেন।
ছাত্রশিবির তাদের প্যানেলে একজন ‘আদিবাসী’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র সদস্য সর্ব মিত্র চাকমাকে মনোনয়ন দেয়। সদস্যপদে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। এ ধরনের সদস্য পদে সাধারণত ৪ হাজার ৫ হাজার ভোট আসে। কিন্তু সর্ব মিত্র পেয়েছেন ৮ হাজারেরও বেশি ভোট। নির্বাচনে ১৮টি হলের মধ্যে একমাত্র সংখ্যালঘুদের হল জগন্নাথ হলে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল বিজয়ী হতে পারেনি। বলা যায় কোনো ভোটই পায়নি। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে জগন্নাথ হলে তারা ভোট পেয়েছে যথাক্রমে ১০, ৫ ও ৭ ভোট।
ভোটের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নারী শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে ছাত্রশিবিরের প্যানেলকে বেশি ভোট দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি ছাত্রী হলে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
ডাকসুতে ছাত্রশিবিরের এই বিজয়কে ইংরেজিতে ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি বলে। বাংলায় বলে ভূমিধস বিজয়। আর আমি বলি, এটি কল্পনাতীত বিজয়। পাগল (ক্রেজি) আর শিশুসুলভ মানসিকতা (চাইল্ডিশ) ছাড়া নির্বাচনের এমন ফলাফলের কথা কেউ হয়তো কল্পনাও করেননি!
ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম। একই সঙ্গে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে উমামা লিখেছেন, ‘সম্পূর্ণ নির্লজ্জ কারচুপির নির্বাচন… ৫ আগস্টের পরে জাতিকে লজ্জা উপহার দিলো ঢাবি প্রশাসন। শিবির পালিত প্রশাসন।’
নির্বাচনে এই ফলাফল কেন হলো? ডাকসুতে কী-ফ্যাক্টরগুলো কি ছিল? সাধারণ ছাত্রছাত্রীদেরই-বা চাওয়া কি? শিক্ষার্থীরা চেয়েছেন, ক্যাম্পাসের সুন্দর পরিবেশ। যেখানে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবেন। হল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে ধরে মিছিলে নিয়ে যাওয়া হবে না। ছাত্রনেতারা ক্যান্টিনে বিনাপয়সায় খাবেন না। গেস্টরুমকে নিজেদের প্রমোদকক্ষ বানাবেন না। বিগত দিনে এসব ক্ষেত্রে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনকে দেখেছে ছাত্রছাত্রীরা। তাই এবার শিবিরে আস্থা রাখতে চেয়েছেন ঢাবির শিক্ষার্থীরা। অন্য দলগুলোর মতো শিবিরও যদি তা-ই করে তবে তাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।
হয়তো এটা বুঝতে পেরেছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব। ডাকসু বিজয়ী শিবির প্যানেলের কাছে তাই দুটি দাবি জানিয়েছেন তিনি। ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে গালিব লিখেছেন, ‘ঢাবিতে ডাকসুতে বিজয়ী শিবির সমর্থিত প্যানেলের কাছে আমার চাওয়া মাত্র দুইটা। এক. মেঘমল্লার (যিনি একজন সংখ্যালঘু ছাত্রনেতা) যেন মনের খুশিতে যতটা চায় ততটা শিবিরকে গালাগালি করতে পারে—এমন একটা অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। দুই. দল-মত-পোশাক নির্বিশেষে ছাত্রীরা যেন কোনো হ্যারাসমেন্ট বা বুলিংয়ের শিকার না হয়, এমন একটা ভয়ডরহীন নিরাপদ পরিবেশ।’
নির্বাচনে বিজয়ের পর একই সুরে কথা বলেছেন, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘… আমরা সারাদেশের কোথাও কোনো মিছিল করবো না। শুধু মহান রবের নিকট সিজদার মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করবো। এই বিজয় আল্লাহর একান্ত দান। আমরা অহংকারী হবো না, সবার প্রতি উদার ও বিনয়ী থাকবো। স্বপ্নের ক্যাম্পাস গড়ার পথযাত্রী, আমরা থামবো না। প্রিয় মাতৃভূমি হবে সবার বাংলাদেশ।’
ডাকসু বিজয়ী ছাত্রশিবির নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা লিখেছেন, এই বিজয় মুসলিমের, এই বিজয় অমুসলিমের। এই বিজয় হিজাবীর, এই বিজয় নন হিজাবীর।
লেখাটা শেষ করি ডাকসু ভোটে ধরাশায়ী স্বতন্ত্র্য প্রার্থী ‘ভাইরাল’ আশিকের একটি কথা দিয়ে। ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদপ্রার্থী হয়ে প্রচারণায় নতুন ঢঙের কারণে আলোচনায় এসেছিলেন আশিকুর রহমান। সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়েছিলেন ভাইরাল। বলেছিলেন, তিনি অন্তত মেঘমল্লারকে হারাতে চান। কিন্তু ভোটের মাঠে সেই জনপ্রিয়তার প্রতিফলন মেলেনি। ফলাফল ঘোষণার পর ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাসে আশিক লেখেন, ‘তোমার অবশ্যই প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা উচিত। ভেবেছিলাম, যাকে হারিয়ে অন্তত সেকেন্ড লাস্ট হবো, সে আজ ১৯ জনের মধ্যে তৃতীয় পজিশনে, আর আমি ৬ষ্ঠ পজিশনে। আপনার প্রতি সম্মান বেড়ে গেলো ভাই।’
এরপর আশিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি লিখেন। বলেন, ‘আপাতত পড়ালেখায় মনোনিবেশ করি।’
পরিশিষ্ট:
ডাকসুর নির্বাচন পুরো বাংলাদেশকে একটি ভূমিধস নাড়া দিয়ে গেছে। ঘুরিয়ে দিয়েছে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। ডাকসু নির্বাচন শুধু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের একটি অ্যাসিড টেস্ট নয়, জাতীয় রাজনীতিতে নতুন হিসেব-নিকাষেরও ইংগিত। ধারণা করা যায়, এই সমীকরণ আসছে বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণের খোরাক যোগাবে।

