সম্পূর্ণরূপে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এবং জনগণের শতভাগ প্রত্যাশা পূরণ করে আগামী দিনে একটি আধুনিক, পেশাদার ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) বর্তমান আইনি কাঠামোতে আমূল সংস্কার এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতামূলক এলিট ফোর্স গঠনে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। আজ সোমবার (১৮ মে, ২০২৬ / ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) দুপুরে রাজধানীর উত্তরার কুর্মিটোলায় র্যাব ফোর্সেস সদর দপ্তরে বাহিনীর ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই যুগান্তকারী তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নেবে না: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে
র্যাবের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা (Sanction) প্রত্যাহারের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, “বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে শেখ হাসিনা তাঁর একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার উদগ্র বাসনা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এই এলিট ফোর্সকে পুতুলের মতো ব্যবহার করেছিলেন। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আইনবহির্ভূত ও বিপথগামী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ সমগ্র প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার অপরাধের দায়-দায়িত্ব পুরো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে স্ব-স্ব বাহিনীর নিজস্ব আইনি কাঠামো অনুযায়ী কঠোর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের অনুশাসন দেওয়া হয়েছে। একই সাথে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নতুন আইনের অধীনে যখন এই বাহিনীকে সংস্কার, পুনর্গঠন কিংবা সম্পূর্ণ নতুনভাবে নামকরণ (Rename) করা হবে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচকভাবে পুনর্বিবেচনা করবে।
ভেঙে ফেলা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ‘অ্যাডহক’ আইনি কাঠামো
আইনি সংস্কারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৫-২০ বছর যাবত র্যাব সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাধীন আইনের অধীনে পরিচালিত না হয়ে, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBN) আইনের একটি বিশেষ ধারার ওপর ভিত্তি করে মূলত ‘অ্যাডহক’ বা অন্তর্বর্তীকালীন ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছিল। একটি রাষ্ট্রীয় এলিট ফোর্স এভাবে সুদীর্ঘকাল চলতে পারে না।
এই আইনি ত্রুটি ও শূন্যতা দূর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘আইন প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করেছে, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন। প্রস্তাবিত নতুন আইনে বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্ব (Authority), দায়িত্বের পরিধি (Responsibility) এবং একই সাথে কঠোর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা (Transparency and Accountability) নিশ্চিতকরণের সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা হবে। বাহিনীর বর্তমান সম্পদ, লজিস্টিকস ও সক্ষমতা এই নতুন আইনের অধীনে প্রতিস্থাপিত হবে।
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ ও গুমের শিকার ভিকটিমদের বিচার
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদ্বিচ্ছা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুপ্রসিদ্ধ প্রবাদ ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ (Morning shows the day) উল্লেখ করে বলেন, “বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত তিন মাসে পুলিশ, র্যাব কিংবা অন্য কোনো বাহিনীকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা কোনো দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। জনগণের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এই বাহিনীর একমাত্র লক্ষ্য।”
বিগত সরকারের আমলের গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত এবং বিচারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, পূর্ববর্তী গুম কমিশনের কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের (Punitive measures) সুনির্দিষ্ট আইনগত এখতিয়ার ছিল না। ফলে এক ধরণের আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল (ICT) আইন সংশোধন ও শক্তিশালীকরণের কাজ করছে। এই আইনের সংস্কার সম্পন্ন হলে গুমের শিকার, গুমের হুমকিপ্রাপ্ত কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সকল প্রকার অপরাধের বিচার সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় এই বিশেষ আদালতেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং ভিকটিম বা তাদের পরিবার সরাসরি দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার পাবেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদ উর রহমান, আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির, র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ-সহ বিভিন্ন সামরিক ও অসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

