রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরেজমিনে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন সলিমপুরের ভাগ্য নির্ধারণে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। এই পরিদর্শনের পর স্পষ্ট বার্তা মিলেছে—কেবল দৃশ্যমান সন্ত্রাসী নয়, এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদেরও রেহাই মিলবে না।
জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধের খতিয়ান উল্টাতে গেলে দুটি নাম সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। নাম দুটি হলো-মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং রোকন উদ্দিন। এরা মূলত এই পাহাড়ী অপরাধ সাম্রাজ্যের দুই স্তম্ভ, যারা হাজার হাজার একর সরকারি পাহাড় কেটে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়েছে।
মদদপুষ্ট ইয়াসিন সাম্রাজ্য
অনুসন্ধানে জাানা যায়, তথাকথিত ‘ছিন্নমূল’ নেতা ইয়াসিন সলিমপুরে নিজের একচ্ছত্র শাসন কায়েম করেছিল। সরকারি পাহাড় কেটে প্লট বরাদ্দ দেওয়া, নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা এবং সলিমপুরের ভেতরে নিজস্ব আদালত ও ‘টর্চার সেল’ পরিচালনা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। তার বিরুদ্ধে খুন, পাহাড় কাটা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ কয়েক ডজন মামলা রয়েছে।
রোকনের বিকল্প অপরাধ বলয়
ইয়াসিনের পাশাপাশি জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রোকন উদ্দিন গড়ে তোলে আরেক ভয়ংকর রাজত্ব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পাহাড়ের চূড়ায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নিজস্ব বাঙ্কার ও ক্যাডার বাহিনী পরিচালনা করত রোকন। বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তার মূল ব্যবসা।
জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধীদের ঔদ্ধত্য কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল, তা তাদের একের পর এক আইন অমান্য ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় প্রমাণিত। এই জনপদ কেবল ভূমিদস্যুতার কেন্দ্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর সরাসরি আঘাত হানার এক বিপজ্জনক ফ্রন্ট।
সলিমপুরের অপরাধের কালো ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস অধ্যায় ছিল বিগত বছরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সরাসরি আক্রমণ। এর আগে পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানা ও মাদকের খোঁজে গিয়ে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাহিনীকে। সেখানে সন্ত্রাসীদের নির্মম হামলায় র্যাবের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডই স্পষ্ট করে দেয় যে, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরের অপরাধীরা রাষ্ট্রীয় আইনকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না।
নিজেদের অভয়ারণ্য ধরে রাখতে এই বাহিনী এতটাই বেপরোয়া যে, তারা সরাসরি সরকারের এলিট ফোর্স র্যাবের ওপর চড়াও হতে দ্বিধা করেনি। সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ও অপরাধীদের দমনের উদ্দেশ্যে স্থাপিত র্যাব ক্যাম্পে সংঘবদ্ধভাবে সশস্ত্র হামলা চালায় ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর ক্যাডাররা। একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্যাম্পে হামলার ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ধৃষ্টতা।
তারআগে, অবিশ্বাস্য ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয় এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। জঙ্গল সলিমপুরে মূল সড়কের সাথে সংযোগকারী রাস্তাগুলো তারা ভারী বুলডোজার ও স্কেভেটর দিয়ে কেটে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যেন প্রশাসনের গাড়ি, পুলিশ বা র্যাব ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। একটি অপরাধী চক্র সরকারি পাহাড়ের ভেতর বুলডোজার চালিয়ে সড়ক যোগাযোগ ধ্বংস করে দেওয়ার এই ঘটনা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।
গত কয়েক মাসে জঙ্গল সলিমপুরকে কেন্দ্র করে এই চরমপন্থী কর্মকাণ্ডগুলো প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
সরকারের মেগা প্রকল্প ( হাইটেক পার্ক, নাইট সাফারি পার্ক ও কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রশাসন জঙ্গল সলিমপুরের কয়েক হাজার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পানির লাইন কেটে দেয়। এর ফলে সন্ত্রাসীদের আয়ের মূল উৎসে বড় ধাক্কা লাগে। এর জবাবে মহাসড়ক অবরোধ করে এবং সাধারণ নারী-শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুনরায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় তারা।
জনমনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ইয়াসিন বা রোকনের মতো সাধারণ অপরাধীরা কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর পাহাড়ী ভূমি দখল করে রাখল, কীভাবে তারা র্যাব ক্যাম্পে হামলা বা বুলডোজার দিয়ে রাস্তা কেটে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখাল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক ‘গডফাদারদের’ আশ্রয়ে।
স্থানীয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ইয়াসিন ও রোকন মূলত ছিল দাবার ঘুঁটি। এই পাহাড় কাটার কোটি কোটি টাকার ভাগ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর হামলার রাজনৈতিক ঢাল এসেছে প্রভাবশালী মহলের কাছ থেকে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং কতিপয় জনপ্রতিনিধির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মদদ ছাড়া এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল।
তথ্যাভিজ্ঞমহলের মতে, রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর হুঁশিয়ারি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। জঙ্গল সলিমপুরকে সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত করতে হলে কেবল ইয়াসিন বা রোকনকে খাঁচায় পুরলেই চলবে না; বরং যারা তাদের দিয়ে র্যাব ক্যাম্পে হামলা করিয়েছে, সড়ক কাটার বুলডোজার সরবরাহ করেছে এবং কোটি কোটি টাকার ভাগ নিয়েছে, সেই গডফাদারদেরও চিহ্নিত করতে হবে। তারা সমাজে যত বড় প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। তা না হলে, ইয়াসিন-রোকন শেষ হলেও সলিমপুরে আবার নতুন কোনো নামের জন্ম হবে।

