দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বহুগুণে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক বড় প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি কিংবা কোনো বিদেশি নাগরিক যদি বাংলাদেশে নতুন কোনো বিনিয়োগ নিয়ে আসেন, তবে সেই বিনিয়োগকৃত মোট অর্থের ওপর সরাসরি ১ দশমিক ৫ শতাংশ ইনসেনটিভ বা নগদ কমিশন দেওয়া হবে। একই সাথে দেশের প্রকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের চাকা সচল করতে ৯ শতাংশ সুদে ৬ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজ ১০ জুন (বুধবার) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনের চতুর্থ দিনে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই মেগা ঘোষণাগুলো দেন। বিদেশি বিনিয়োগ আনলে কমিশন পাওয়ার এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তটি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও শিল্পায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
দেশীয় বিনিয়োগের সুরক্ষায় ৬ হাজার কোটি টাকার মেগা তহবিল
সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের সরকার শুধু বিদেশি বিনিয়োগই নয়, বরং দেশীয় বিনিয়োগকারীদেরও সমানভাবে উৎসাহিত করতে চায়। এই লক্ষ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার জন্য নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ (ডিরেgulation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন নতুন উদ্যোগ ও সংস্কারের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
বিনিয়োগের সুবিধার্থে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সংসদকে জানান যে, সরকারের উচ্চপর্যায়ে অর্থনীতির সার্বিক সূচক ও বিভিন্ন বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সুদের হার কমানো যদি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সত্যিই কার্যকর ভূমিকা রাখে, তবে সে বিষয়ে সরকার পরবর্তীতে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত রূপরেখা বা সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বেগম সাবিকুন্ নাহারের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “বিগত স্বৈরাচারের সময় এই দেশের অর্থনীতিতে কী ভয়াবহ লুটপাট ও ক্ষতি হয়েছে, তা দেশের সর্বস্তরের জনগণ ভালো করেই জানেন। অর্থনীতি এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়, যার সুফল বা কুফল কোনোটিই একদিনে পাওয়া যায় না। স্বৈরাচারী সরকারের খারাপ পলিসি ও অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব যেমন ধীরে ধীরে আজ আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে, ঠিক একইভাবে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতেই হবে।”
উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ৬ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন সম্পন্ন করেছে। দেশের যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অতীতে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে ও বৈরি পরিস্থিতিতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ী হিসেবে সত্যিকার অর্থেই যাদের বাজারে ক্রেডিবিলিটি বা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে; তারা এই তহবিল থেকে মাত্র ৯ শতাংশ সুদে সহজ শর্তে ঋণ সহযোগিতা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর নতুন অর্থনৈতিক প্যাকেজ ও ঘোষণার মূল খতিয়ান:
| নতুন ঘোষিত প্রণোদনার খাত | ইনসেনটিভ বা সুদের হার | তহবিলের আকার ও লক্ষ্য | বিশেষ সুবিধা ও উদ্দেশ্য |
| বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আনয়ন | ১.৫% নগদ কমিশন / ইনসেনটিভ। | কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। | প্রবাসী ও বিদেশিদের মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। |
| ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রকৃত উদ্যোক্তা ঋণ | ৯% সুদের হার (সহজ শর্তে)। | ৬,০০০ কোটি টাকা (বাংলাদেশ ব্যাংক)। | সংকটে পড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাকা পুনরায় সচল করা। |
আইনি বাধা দূর করে মুনাফা নিজ দেশে ফেরানোর সুযোগ
সংসদ সদস্য বেগম জহরত আবির আদিব চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যার সমাধান করার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার (প্রফিট রিপ্যাট্রিয়েশন) ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যেসব আমলাতান্ত্রিক ও আইনি বাধা বিদ্যমান রয়েছে, তা স্থায়ীভাবে দূর করতে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতার শেষাংশে বলেন, “সম্প্রতি সরকারের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, বিদেশ থেকে কোনো বাংলাদেশি বা বিদেশি নাগরিক যদি বৈধ উপায়ে বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ আনতে পারেন, তবে তাঁকে মোট বিনিয়োগের ১.৫ শতাংশ কমিশন দেওয়া হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং বিদেশে বসবাসরত অত্যন্ত দক্ষ ও প্রভাবশালী বাংলাদেশিরা বিদেশি বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এর ফলে দেশের রিজার্ভ ও বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে।”

