গ্রেপ্তার সিয়ামের নামে ভুয়া স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ড ছড়িয়েছে আওয়ামীপন্থী সাইবার অপরাধীরা: ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশনে চাঞ্চল্যকর তথ্য

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

গত ১৭ জুন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ওইদিন তিনি ১৫টি ছবি যুক্ত করে রাত ৯টা ৫৩ মিনিটে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। পোস্টে ‍যুক্ত একটি ছবিতে দেখা যায়, জাইমা রহমানের পাশে খেলোয়াড়সহ অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেন এবং জাইমা ডি-বক্সের মধ্যে থেকে গোলবারের দিকে ফুটবলে শট নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই ছবিটি ব্যাপক ভাইরাল হয় এবং অনেকেই তার আত্মবিশ্বাসী শট নেওয়ার ভঙ্গির প্রশংসা করেন।

এর ঠিক তিন দিন পর, ২০ জুন বিকাল ৫টা ৭ মিনিটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ‘Ryan Draper’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ‘Sabidul Islam Siam’ নামের একটি আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যসহ ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল। এই পোস্টের পর স্ক্রিনশটটি সত্য বিবেচনা করে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে শেয়ার করেন এবং সাবিদুল ইসলামের বিচারের দাবি জানান। এরপর ঘটনাটি গড়ায় থানা-পুলিশ পর্যন্ত।

ছাত্রদলের অভিযোগ ও মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে সিয়াম গ্রেপ্তার

শনিবার (২০ জুন) রাতে জাইমা রহমানকে নিয়ে আপর্ককর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানায় পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় ছাত্রদলের দুই নেতা। আখাউড়া পৌর শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী রিফাতুল ইসলাম তারেক এবং উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক পলাশ মিয়া পৃথকভাবে অভিযোগ দুটি দায়ের করেন।

পরবর্তীতে রোববার (২১ জুন) দিবাগত রাতে মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সদর উপজেলায় তার খালার বাড়ি থেকে সিয়ামকে আটক করে আখাউড়া থানা পুলিশ। এ ব্যাপারে আখাউড়া থানার ওসি জাবেদ উল ইসলাম জানান, পূর্বের একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এদিকে ছাত্রদল নেত্রী Tawhida Sultana ফেসবুকে ‘Ryan Draper’-এর পোস্ট করা স্ক্রিনশটটি শেয়ার করে ক্যাপশনে এটিকে শিবিরের রুট লেভেলের প্রোপাগান্ডা বলে দাবি করেন। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলমসহ অনেকেই এটি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন: স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ডের জালিয়াতি যেভাবে উন্মোচিত হলো

দ্য ডিসেন্ট গভীর অনুসন্ধান ও টেকনিক্যাল যাচাই-বাছাইয়ের পর নিশ্চিত হয়েছে যে, সাবিদুল ইসলাম সিয়ামের আইডি থেকে জাইমা রহমানের ছবিসহ কুৎসিত মন্তব্য যুক্ত ফেসবুক পোস্টের যে স্ক্রিনশট ‘Ryan Draper’ নামক ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে মূলত নিম্নলিখিত জালিয়াতিগুলো সনাক্ত করা হয়েছে:

১. একটি মাত্র সোর্সের স্ক্রিনশট ও আর্কাইভের অনুপস্থিতি

সাধারণত কোনো পোস্ট ভাইরাল হলে ভিন্ন ভিন্ন ডিভাইস থেকে নেওয়া একাধিক স্ক্রিনশট দেখা যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ‘Ryan Draper’ এর প্রচারিত একটি মাত্র ভার্সনের স্ক্রিনশটই সবাই শেয়ার বা পোস্ট করছিলেন। ফেসবুকে বিভিন্নভাবে সার্চ করে জাইমা রহমানকে নিয়ে সাবিদের কথিত পোস্টের অন্য কোনো ভার্সন বা আর্কাইভ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফ্যাক্ট চেকার সোহানুর রহমানও এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, একদিন পর্যন্ত বহাল থাকা একটি বিতর্কিত পোস্টের কেবল একটিই স্ক্রিনশট থাকা অস্বাভাবিক।

২. ইন্সপেক্ট এলিমেন্ট (Inspect Element) দিয়ে কোড পরিবর্তন

স্ক্রিনশট নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ার পর ‘Ryan Draper’ জালিয়াতি ঢাকতে একটি ৫৭ সেকেন্ডের স্ক্রিন রেকর্ড প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, সাবিদুল ইসলাম সিয়ামের আইডির প্রথম থেকে স্ক্রল করে জাইমা সংক্রান্ত কথিত পোস্ট পর্যন্ত আসতে ৭টি পোস্ট অতিক্রম করতে হয়। তার মধ্যে চারটি পোস্টে সরাসরি ছবি আপলোড করা হয়েছে, যা প্রোফাইলের বামপাশের ‘Photos’ সেকশনে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু জাইমা রহমান সংক্রান্ত বিতর্কিত ছবিটি প্রোফাইলের মূল ফিডে দেখানো হলেও, বামপাশের ‘Photos’ সেকশনে সেটির কোনো অস্তিত্ব নেই।

এটি মূলত সম্ভব হয়েছে সিয়ামের প্রোফাইলে ঢুকে স্ক্রিন রেকর্ডকারী নিজের ব্রাউজারের ডেভেলপার টুল “ইন্সপেক্ট এলিমেন্ট” এর মাধ্যমে ওয়েবপেইজের এইচটিএমএল (HTML) এবং সিএসএস (CSS) কোড লোকালি পরিবর্তন করার কারণে। বাস্তবে ১৮ জুন সকাল ১০টা ৫ মিনিটে সিয়াম একটি ভিন্ন ফেসবুক পেজের পোস্ট তার ওয়ালে শেয়ার করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ‘আনএভেইলেবল’ হয়ে যায়। অপরাধীরা ওই পোস্টের কোড পরিবর্তন করে তাতে জাইমা রহমানের ছবি ও কুরুচিপূর্ণ টেক্সট বসিয়ে নিখুঁতভাবে স্ক্রিন রেকর্ড ও স্ক্রিনশট তৈরি করে।

৩. পোস্টের সময়ক্রম ও ইমোটিকনের অমিল

স্ক্রিন রেকর্ডে আরও দেখা যায়, জাইমা সংক্রান্ত কথিত পোস্টের ঠিক আগের পোস্টটি ১৮ জুন দুপুর ১টার এবং পরের পোস্টটি ১৭ জুন বিকাল ৬টা ১৪ মিনিটের। মাঝখানে ১৮ জুন সকাল ১০টা ৫ মিনিটের মূল পোস্টটিকে ব্রাউজারে এডিট করার কারণে সিয়ামের প্রোফাইলের আসল টাইমলাইনটি ওলটপালট হয়ে যায়। এছাড়া প্রথম প্রকাশিত স্ক্রিনশটের রিয়েকশন ও কমেন্টের সংখ্যার সাথে ভিডিও স্ক্রিন রেকর্ডের রিয়েকশনের (Angry, Care, Love) কোনো মিল ছিল না, যা সিয়ামের আসল ফেসবুক পোস্টের রিয়েকশন হিস্ট্রির সাথে হুবহু মিলে যায়।

সিয়াম তার নিজ প্রোফাইলে ২১ জুন এক পোস্টে এই অপপ্রচারকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করেছিলেন। তবে সাবিদুল ইসলাম সিয়ামের আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ছাত্রদল সভাপতিকে নিয়ে কিছু ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, যার প্রতিশোধ বা অপপ্রচারের অংশ হিসেবে তাকে এই ফাঁদে ফেলা হয়।

একই সাইবার অপরাধী চক্রের পুরনো ইতিহাস

প্রসঙ্গত, এই একই নেটওয়ার্কের আইডিগুলো এর আগেও জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়িয়েছিল। গত ২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাইমা রহমানকে জড়িয়ে ‘Eshan Chowdhury’ নামের একটি আইডি থেকে কুরুচিপূর্ণ এআই ফটোকার্ড পোস্ট করার পর, সেটিকে এডিট করে ডাকসুর শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যার জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা ও মারামারির ঘটনা ঘটে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, LEO, Ryan Draper, Aronno Abir নামের এই আইডিগুলো অনলাইনে আওয়ামী লীগের সাইবার ফোর্স ‘‘ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশ’’ এর হয়ে ছদ্মনামে কাজ করে। এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে মূলধারার সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের আইডি ও পেজ ডাউন করার সাইবার অপরাধের সাথে জড়িত।

সর্বশেষ নিউজ