দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে পুঁজিবাজারে রেকর্ড উত্থান, ২ বছর পর লেনদেন ১৫০০ কোটি পার

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সরকারের সংস্কারমুখী কার্যক্রমের সুফল মিলতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজারে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মন্দাভাব এবং তারল্য সংকট কাটিয়ে অবশেষে দেশের শেয়ারবাজারে ফিরে এসেছে কাঙ্ক্ষিত প্রাণচাঞ্চল্য ও অভূতপূর্ব তেজিভাব। সরকারের দূরদর্শী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর ইতিবাচক বক্তব্য, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্বের কঠোর সুশাসন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে এক ঐতিহাসিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশেষ করে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ‘ডিএসইএক্স’ (DSEX) টানা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় পৌনে দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে, যা সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।

শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান ও কারসাজির বিরুদ্ধে তোপ

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের এই নাটকীয় ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও কঠোর অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই। বাজার কারসাজি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার পাশাপাশি তিনি প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন।

একই সুরে অর্থমন্ত্রীও তাঁর বাজেট বক্তৃতায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মূল উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য শেয়ারবাজারকে একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে সরকার সব ধরনের নীতিনির্ধারণী ও কর সহায়তা দিতে প্রস্তুত। শীর্ষ দুই নীতিনির্ধারকের এই অভয়বাণী প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে শতভাগ আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।

📈 লেনদেনের মেগা রেকর্ড: সমাপ্ত অর্থবছর শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ব্যাপক উত্থানের মাধ্যমে ৫,৭৬০ পয়েন্টের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এছাড়া দৈনিক লেনদেন দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর ১৫ বিলিয়ন (১,৫০০ কোটি) টাকার ঘর ছাড়িয়ে গেছে।

মাসুদ খানের নতুন কমিশন: সুশাসন ও সংস্কার

বিনিয়োগকারী এবং ব্রোকার হাউস নির্বাহীদের মতে, তদারকি সংস্থা বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন বাজারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান এবং তাঁর দক্ষ কমিশনারদের নিয়ে গঠিত নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কাঠামোগত সংস্কারে হাত দিয়েছে। নতুন কমিশন আইপিও (IPO) প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করা, অনলাইনভিত্তিক সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু এবং বহুজাতিক ও ভালো পারফর্ম করা মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।

পাশাপাশি বাজার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, বাজার এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। বাজারের তারল্য বাড়াতে এবং টেকসই করতে পেনশন ফান্ড, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য নতুন কমিশন যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে, তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

বাজেট উপহার: পুঁজিবাজার-বান্ধব কর ছাড়

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। ফিন্যান্স বিলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর প্রণোদনা ও ছাড় দেওয়া হয়েছে:

  • ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর কর হ্রাস: বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর করের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

  • মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমা প্রত্যাহার: মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত (Tax Rebate) পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের যে সর্বোচ্চ সীমা ছিল, তা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হয়েছে।

  • তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণ: ভালো কোম্পানিগুলোর জন্য বাজারে মূলধন সংগ্রহের আইনি প্রক্রিয়া ও খরচ অনেকাংশে সহজ করা হয়েছে।

এসব যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে বাজেট পাসের পর থেকেই ব্লু-চিপ বা শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের উপচে পড়া আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে টেক্সটাইল, ব্যাংক ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের শেয়ারের হাত ধরে বাজারজুড়ে এখন ক্রেতাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।

পুঁজিবাজারে দীর্ঘ দুই বছর পর আসা এই মেগা প্রাণচাঞ্চল্যের মূল চালিকাশক্তিগুলো এক নজরে:

চালিকাশক্তি (Driving Pillars) মূল পদক্ষেপ (Key Execution) বাজারে প্রভাব (Market Impact)
১. সরকারের নীতি সহায়তা কারসাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণী সহায়তার আশ্বাস। বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার।
২. বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আইপিও প্রক্রিয়ার সরলীকরণ। বাজার কারসাজি চক্রের পতন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন।
৩. বাজেট ২০২৬-২৭ লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) আয়ে কর হ্রাস এবং মিউচুয়াল ফান্ডের কর রেয়াতের সীমা প্রত্যাহার। ডিএসইএক্স ৫,৭৬০ পয়েন্টে উন্নীত এবং দৈনিক লেনদেন ১৫০০ কোটি টাকা পার।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী ও সংস্কারমুখী কার্যক্রমের কারণেই পুঁজিবাজারে এই তেজিভাব দেখা যাচ্ছে। বর্তমানের এই ধারাবাহিকতা এবং বিএসইসির কঠোর নজরদারি বজায় থাকলে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার আগামী দিনে শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্রে পরিণত হবে।

সর্বশেষ নিউজ