দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই এক সংবেদনশীল ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সর্বশেষ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক রক্তক্ষয়ী চিত্র। চলতি বছরের জুন মাসে দেশজুড়ে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জনেরও বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন, যা মে মাসের তুলনায় অনেক বেশি।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যম ও নিজস্ব ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের জুন মাসের এই মেগা রিপোর্টটি প্রকাশ করে সংস্থাটি।
রাজনৈতিক সহিংসতার ব্যবচ্ছেদ: কার সাথে কার সংঘাত?
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের মোট ৫৮টি রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে খোদ বিএনপির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। নিহত ৯ জনের রাজনৈতিক পরিচয় এবং সংঘাতের ম্যাপিং নিচে দেওয়া হলো:
-
বিএনপির অন্তর্কোন্দল: ২১টি ঘটনা, নিহত ৩ জন ও আহত ১৪৬ জন।
-
বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষ: ১৪টি ঘটনা, নিহত ২ জন ও আহত ১১৫ জন।
-
বিএনপি-জামায়াত সংঘাত: ৮টি ঘটনা, নিহত ২ জন ও আহত ৩৬ জন।
-
অন্যান্য সংঘাত: অন্যান্য দলের সাথে সংঘর্ষে নিহত ২ জন।
নিহত ৯ জনের দলীয় খতিয়ান: বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, শিবিরের ১ জন, ইউপিডিএফের ১ জন এবং ১ জন চরমপন্থী দলের সদস্য।
মব জাস্টিস ও গণপিটুনির ভয়াবহতা
জুন মাসে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বা ‘মব জাস্টিস’-এর এক ভয়ানক উৎসব লক্ষ্য করা গেছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে সারা দেশে ৬৩টি গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া মব সহিংসতার শিকার হয়ে ট্রাফিক ও অন্যান্য ডিউটিরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৬৬ জন সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন।
এক নজরে জুনের মানবাধিকার ক্রাইসিস ডাটা
| ক্রাইম সেক্টর (Sector) | ঘটনার সংখ্যা / মামলা (Metrics) | হতাহত ও গ্রেপ্তার (Stats) |
| রাজনৈতিক সহিংসতা | ৫৮টি ঘটনা | নিহত ৯ জন, আহত ৩৪৬ জন। |
| মব জাস্টিস / গণপিটুনি | ৬৩টি ঘটনা | নিহত ৩১ জন, আহত ৬৯ জন। |
| সাংবাদিক নির্যাতন | ৩৯টি ঘটনা | ৪৭ জন হয়রানির শিকার, ৫ জন আটক। |
| মতপ্রকাশে বাধা ও মামলা | ১১টি ডিজিটাল/অন্যান্য ঘটনা | ১১ জন আটক, সাইবার সুরক্ষায় ৪টি মামলা। |
| রাজনৈতিক গ্রেপ্তার | ২৫৭টি ঘটনা (মোট) | ৪,৭৭৫ জন গ্রেপ্তার (আ.লীগ ১৫৫৯, বিএনপি ৩৫)। |
| সীমান্তে ক্রাইসিস | ৫টি বিএসএফ হামলা | ২ জন বাংলাদেশী নিহত, ৪ শতাধিক পুশইনের চেষ্টা। |
সাংবাদিকতা ও মুক্ত চিন্তায় আঘাত
জুন মাসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার মারাত্মকভাবে খর্ব হয়েছে। মাসজুড়ে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫ জনকে আটক এবং ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সমালোচনা করায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে ৪টি পৃথক মামলায় ৯ জনকে অভিযুক্ত করে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
💬 "সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জননিরাপত্তার অভাব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার ও হয়রানি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।"
— ইজাজুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক, এইচআরএসএস।
নারী, শিশু ও শ্রমিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন
প্রতিবেদনের শেষ অংশে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার এক লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরা হয়। জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার (যার ৭১%-ই অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের শিশু)। এছাড়া বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৯ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ভারত ও মায়ানমার সীমান্তে ল্যান্ডমাইন ও গুলিতে আরও ৫ জন নিহত হয়েছেন।

