বন জুড়ে নীরবতা! সুন্দরবনে ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু; বন্ধ হলো পর্যটন, মাছ ধরা ও মধু সংগ্রহ

ন্যাশলাল ডেস্ক
spot_img
spot_img

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ‘সুন্দরবনের’ জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এক বড় ধরণের সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আগামীকাল ১ জুন (সোমবার) থেকে আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। এই সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণের পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জেলে, বাওয়ালি (কাঠুরে) এবং মৌয়ালদের (মধু সংগ্রহকারী) প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

আজ রবিবার (৩১ মে) বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তি জারি করার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য কোনো ধরণের পাস বা পারমিট ইস্যু করা হবে না বলে জানিয়েছে কতৃপক্ষ।

প্রজনন মৌসুম ও প্রাকৃতিক পুনরুত্পাদন নিশ্চিত করার প্রয়াস

বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান হোসেন জানান, জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ মৎস্য প্রজাতি, বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদের মূল প্রজনন মৌসুম (Peak Breeding Season)। এই সময়ে বনের ভেতরের নদী ও খালগুলোতে বিভিন্ন মাছ ডিম ছাড়ে, বন্যপ্রাণীরা নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করে এবং গাছের বীজ থেকে নতুন চারা গজায়।

সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাুল করিম চৌধুরী বলেন, “পর্যটকবাহী ইঞ্জিন চালিত বোট এবং বনজীবীদের নৌকার অতিরিক্ত চলাচলের কারণে বনের ভেতরের শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হয়, যা বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত করে। এই তিন মাস যদি বন সম্পূর্ণ মানুষের কোলাহলমুক্ত থাকে, তবে বনের হরিণ, বাঘ, পাখি ও মাছের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে অনেক শক্তিশালী করবে।”

কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের যৌথ স্কোয়াড: অনুপ্রবেশে কঠোর ব্যবস্থা

বন বিভাগ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বনের গভীরে যেন কোনো প্রকার চোরাশিকারী বা অবৈধ মৎস্য শিকারীরা প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। মধ্যবর্তী এই সময়ে সুন্দরবনের জল ও স্থল সীমানায় বন বিভাগের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ এবং মৎস্য অধিদপ্তর যৌথভাবে বিশেষ স্পিডবোটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কোনো ব্যক্তি যদি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করে, তবে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত বন আইনে কঠোর ও জামিন অযোগ্য মামলা দায়ের করা হবে।

কর্মহীন উপকূলের হাজারো বনজীবী, সরকারি সহায়তার দাবি

প্রতি বছরের মতো এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনে তীব্র আর্থিক সংকট ও বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কাঁকড়া শিকারী কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিন মাস বনে যাওয়া বন্ধ থাকার মানে আমাদের ঘরে উনুন না জ্বলা। আমরা পরিবেশ রক্ষার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি, কিন্তু এই তিন মাস আমাদের পরিবার কীভাবে বাঁচবে, সেই বিষয়ে সরকারের ভাবা উচিত।”

আরেক স্থানীয় জেলে আনিসুর রহমান জানান, দাদনদার এবং বিভিন্ন এনজিও (NGO) থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে অনেক উপকূলীয় জেলে এই সময়ে এলাকা ছেড়ে শহরে দিনমজুরের কাজ করতে চলে যান। শুধু জেলাই নয়, সুন্দরবনের নীলডুমুর, মংলা ও শরণখোলার ট্যুরিস্ট ট্রলারের কয়েক হাজার চালক ও স্টাফও আগামী তিন মাস সম্পূর্ণ বেকার থাকবেন। এই মানবিক দিকটি বিবেচনা করে বনজীবী ও নিবন্ধিত ট্রলার শ্রমিকদের জন্য বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থা বা চাল সহায়তার জন্য মৎস্য অধিদপ্তর ও বন বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ