বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে এসে বলেছিলেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান, যা মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল, আগ্রহ এবং আশার সঞ্চার করেছে। বহু বছর তিনি একটি উন্নত দেশে কাটিয়েছেন। তাই সুযোগ পেলে নিজ মাতৃভূমির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তিনি বিশেষ কিছু উদ্যোগ নেবেন এটাই স্বাভাবিক। ৫৫ বছর পেরিয়ে গেল, এদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণে তেমন কোনো সফলতা অর্জন করতে পারিনি।
আরও ব্যর্থ হওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। ১৫ বছরের গণতন্ত্রের মুখোশ পরা একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার বাংলাদেশকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। এটা প্রমাণিত হয়েছে হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা কর্তৃত্ববাদী সরকার বিদেশে পাচার করেছে।
কারো কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়, বাংলাদেশকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। ১. স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য ডিটারন্স, ২. একটি শক্তিশালী অর্থনীতি এবং ৩.আইনের শাসন।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের প্রাক্কালে, একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য সমুদ্রকেন্দ্রিক নীল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি ট্রান্সফার নিয়ে সামান্য আলোকপাত করব। বাংলাদেশ ভারত মহাসাগরের তিরবর্তী একটি দেশ। এই মহাসাগরে বাংলাদেশের একটি বে (Bay) রয়েছে, যাকে আমরা বে অফ বেঙ্গল বা বঙ্গোপসাগর বলে থাকি। একবিংশ শতাব্দীতে ভারত মহাসাগরের জলরাশি রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করবে। জ্বালানির ৮০% এই ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর দিয়েই চলাচল করে।
আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই সমুদ্রকেন্দ্রিক হতে হবে। চীন, জাপান, ভারত, রাশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ সকলের কাছে আমাদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। কারণ আমাদের বঙ্গোপসাগর আছে। বঙ্গোপসাগর এই বৃহৎ শক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারো কারো অস্তিত্বের জন্য তাদের জ্বালানি শক্তি এবং আমদানি রপ্তানি ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নীল অর্থনীতি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জাপান না হলেও মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের মতো একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে যে গ্রেট পাওয়ারগুলো বাংলাদেশের সাথে পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে চান। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে BRI-তে যোগ দিয়েছে এবং ইন্দোপেসিফিকও আহ্বান করা হয়েছে।
জাপান একটা প্রযুক্তির দেশ। জাপানের শত্রু রাষ্ট্রগুলো জাপানের একটি বিষয়কে ভয় পায়, সেটি হল প্রযুক্তিতে জাপানের আপার হ্যান্ড।
আমাদের নীল অর্থনীতিকে জাপান একটি ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কেন রাখবে? বাংলাদেশ জাপানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? জাপান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দাতা দেশ। বাংলাদেশকে শুধু ভালোবেসে, জাপান এই ব্যাপক সাহায্য সহযোগিতা করেছে, সেটা ভাবার কোন কারণ নেই। ভূ রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভৌগলিক কৌশলগত অবস্থান, জাপানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাপান বঙ্গোপসাগরে এই গুরুত্বপূর্ণ তীরবর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে যে কোনও মূল্যে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। বিগ বি (Big B) এবং মাতারবাড়িতে জাপানের উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে।
তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নীল অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য জাপানের কাছে যুক্তিসঙ্গত যে কোনো সহযোগিতা চাইলে, জাপান আগ্রহ ভরে সেটা সাহায্য করবেন বলে এই লেখক বিশ্বাস করেন।
আমরা সমুদ্র বিজয়ী করেছি। কিন্তু এই বিজয় নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। সত্যিকারের বিজয় আমাদের তখনই হবে যখন আমরা এই সমুদ্রের সম্পদকে আমাদের বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের জন্য ব্যবহার করে একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ করতে পারব।
থাইল্যান্ড থেকে আমরা কিছু শিক্ষা নিতে পারি। দেশটি ২০২৪ সালে প্রায় ৭.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রক্রিয়াজাত টুনা উল্লেখযোগ্য। এই সাফল্য শুধু মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল নয়; মাছ আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মাননিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রী, জাপানের কাছে এই নীল অর্থনীতির জন্য বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ ধরার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি সাহায্য চাইতে পারেন। মাছ এবং মাছ জাতীয় পণ্য, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং জাপানে ভীষণ চাহিদা রয়েছে। আমরা এই সকল দেশে মাছ রপ্তানি করতে পারি। আমার জাপানের থাকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, সেখানে মানুষজন ভীষণভাবে সামুদ্রিক মাছ পছন্দ করে।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য শুধুমাত্র রেমিটেন্স এবং গার্মেন্টসের উপর আমাদের নির্ভর করলে চলবে না। করোনার সময়, আমরা দেখেছি আমাদের অদক্ষ শ্রমিকের বাজার কতটা ভল্নারেবল ছিল, অন্যদিকে, গার্মেন্টস শিল্প যদিও আমাদের অর্থনীতির একটা লাইফ লাইন, কিন্তু এই গার্মেন্টস শিল্প, সরকার পরিবর্তনে, পশ্চিমা শক্তির একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই আমাদের অবশ্যই একটি ডাইভার্স এক্সপোর্ট পলিসি থাকতে হবে। সুতরাং এটা সময়ের দাবি যে আমাদেরকে শুধুমাত্র গার্মেন্টস নির্ভর হওয়া যাবে না। মাছ ও মাছ পণ্য রপ্তানি একটা বড় নতুন খাত হতে পারে।
সমুদ্রের তলদেশের মণিমাণিক্য (রূপক অর্থে), অর্থাৎ খনিজ, আর তরল সোনা (তেল এবং গ্যাস) ইত্যাদি কি দশকের পর দশক অনাবষ্কৃত থেকেই যাবে? এই আবিষ্কার আমাদের মাথাপিছু আয়কে কয়েকগুণ বাড়াতে পারে। সমুদ্রের তলদেশের সম্পদ আহরণ করার জন্য বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সাহায্য চাইতে পারেন এবং যৌথভাবে সন্ধান করতে পারেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA), দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে। পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক জরিপ, আধুনিক গবেষণাজাহাজ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলের সীমাবদ্ধতায় বাংলাদেশ তার অফুরন্ত সম্পদকে ব্যবহার করতে পারছে না। বাংলাদেশের নীল অর্থনীতিতে জাপান নিম্মক্তভাবে সাহায্য করতে পারেঃ
প্রথমত, সামুদ্রিক গবেষণা ও সম্পদ অনুসন্ধান। জাপানের Japan Agency for Marine-Earth Science and Technology (JAMSTEC)-এর সঙ্গে যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রতল, পানির গভীরতা, স্রোত, জীববৈচিত্র্য এবং সম্ভাব্য সামুদ্রিক সম্পদের বৈজ্ঞানিক জরিপ চালানো যেতে পারে। জাপান আধুনিক গবেষণাজাহাজ, মাল্টিবিম সোনার, পানির নিচে পরিচালিত রোবট (ROV), স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণযন্ত্র এবং সমুদ্রতথ্য বিশ্লেষণের প্রযুক্তি দিতে পারে। এতে কোথায় কী সম্পদ রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। যৌথ গবেষণাগার, গবেষণাজাহাজ, পিএইচডি বৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থী বিনিময়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষভাবে মেরিন বায়োটেকনোলজি, ফিশারিজ ইঞ্জিনিয়ারিং, ওশানোগ্রাফি ও মেরিন রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে যৌথ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, জাপানিজ ইউনিভার্সিটির সাথে মেরিটাইম সিকিউরিটি ও অনন্যা সংশ্লিষ্ট বিষয়েও যৌথভাবে গবেষণা করতে পারে।
তৃতীয়ত, গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ। জাপান বাংলাদেশের জেলেদের আধুনিক ফিশ-ফাইন্ডিং সোনার, ইকো-সাউন্ডার, স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্রতথ্য, জিপিএস, নিরাপদ নৌযান এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী মাছ ধরার প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাছের অবস্থান শনাক্তকরণ, উপযুক্ত জাল নির্বাচন এবং আহরণের পর মাছের গুণগত মান সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তবে বৈজ্ঞানিক মজুত নিরূপণ ও টেকসই আহরণসীমা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি। জাপানি সহযোগিতায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী এলাকায় আধুনিক ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার, আইস প্ল্যান্ট, কোল্ড চেইন, হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এতে মাছের অপচয় কমবে, মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং জাপানসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পঞ্চমত, সামুদ্রিক জলজ চাষ ও জীবপ্রযুক্তি। জাপানের অভিজ্ঞতায় উপযোগী স্থানে সামুদ্রিক শৈবাল, ঝিনুক, কাঁকড়া এবং খাঁচায় মাছ চাষের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনশিল্পের সম্ভাবনাও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা সম্ভব।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে,পাকিস্তান জঙ্গি বিমান তৈরি করছে, অত্যাধুনিক মিসাইল তৈরি করছে। সেক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তিতে কেন এত পিছিয়ে আছি? জাপানের মতো একটি প্রযুক্তিতে সেরা দেশ থেকে আমরা প্রযুক্তি ট্রান্সফার করতে চাই। তারেক রহমান বাংলাদেশে প্রযুক্তির নতুন যুগের সূচনা করবেন এই প্রত্যাশা এখন আমাদের। জাপানের সহযোগিতায় বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হোক ।

