শিক্ষার্থীদের এমন ফলাফল শিক্ষার মান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিই কি এই ফলাফলের প্রধান কারণ, নাকি প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতির প্রতিফলন ঘটেছে এবারের ফলাফলে—এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাশের হারের হিসাবে এবারের অবস্থান দ্বাদশ সর্বনিম্ন। এর আগে ১৯৯৬ সালে পাশের হার ছিল সবচেয়ে কম, ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০০২ সালে ২৭ দশমিক ০৯ এবং ২০০১ সালে ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন।
তবে এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২৫ সালে ৫ লাখ ৮ হাজার, ২০১৮ সালে ৪ লাখ ৩৭ হাজার, ২০১৭ সালে ৩ লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০১৯ সালে ৩ লাখ ৪৮ হাজার শিক্ষার্থী ফেল করেছিলেন। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৮৬ হাজার এবং ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এ ফলাফলের পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি দায়ী নয়। প্রাথমিক স্তর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। সেই ঘাটতি নিয়েই তাদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উঠতে হচ্ছে। এর সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, পাঠদানে শিক্ষকদের অনাগ্রহ এবং কোচিংনির্ভর পড়াশোনাও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বাড়তি সহায়তা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটও প্রকট।
এবারের ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তাঁর মতে, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পাশের হার বাড়ানো শিক্ষার মানোন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য।
শিক্ষাবিদ ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, এবারের ফলাফল কোনো বিপর্যয় নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও কাটছে না। পরীক্ষার ফলে সেই ঘাটতিরই প্রতিফলন ঘটেছে।
শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, এ সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নও করতে হবে। শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফেরানো, পাঠদানের মান বাড়ানো এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান সরকার বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ চলছে। নতুন কারিকুলাম তৈরিসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করলেই শিক্ষার মান বাড়বে না। এর যথাযথ বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত ক্লাস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কোন পর্যায়ে এবং কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা জরুরি।
সব মিলিয়ে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করাই নয়, প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

