মানুষ পুলিশ, পুলিশ মানুষ এডিসি হারুন-সানজিদা এবং আমাদের কেমন সিস্টেম?

আমিনুল ইসলাম
spot_img
spot_img

এডিসি হারুনকাণ্ডে ঘটনা একেক সময় একেক দিকে মোড় নিচ্ছে। ডিবি প্রধান হারুন বলেছেন- এডিসি হারুনের গায়েই নাকি আগে হাত তুলেছে ওই সরকারি কর্মকর্তা। এদিকে ওই কর্তার স্ত্রী, মানে যার সাথে এডিসি হারুনের বিরাট ভালো সম্পর্ক- তিনি বলেছেন, ‘আমার স্বামীই স্যারকে মেরেছে।’

তো কে কাকে মেরেছে। কে কার সাথে পরকীয়া করছে। কে সংসার বাঁচাতে চাইছে। এইসব নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই। যার ইচ্ছে গিয়ে প্রেম করুক। নইলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরুক। আমার এতে কিছু যায়-আসে না। তবে সমাজ বিজ্ঞানের একজন ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে কিছু কথা বলার আছে।

আমরা যখন গবেষণায় কোয়ালিটেটিভ ডাটা এনালাইসিস করি, তখন ল্যাংগুয়েজ ডিসকোর্স এনালাইসিসও করি। আমি কখনো আমার লেখায় জটিল কোন টার্ম ব্যবহার করি না। কারণ আমি সাধারণ মানুষের জন্য লিখি। তারা যাতে পড়ে বুঝতে পারে। সে জন্য আমি সব সময় সহজ ভাষায় লেখার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের দেখবেন সোজা জিনিসকেও কঠিনভাবে ব্যাখ্যা করেন। নানান সব শব্দ ব্যবহার করে বিরাট জ্ঞানী সাজার চেষ্টা করে এরা। এই যেমন হেজেমনি, ডিসকোর্স এইসব শব্দ ব্যবহার করে এরা জাতে উঠতে চায়। এদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এমনই। এরা যে কোন সহজ কিছুকে এমন কঠিনভাবে পড়ায়, কারো পক্ষে বুঝাই কঠিন! এরা মনে করে- কঠিনভাবে পড়ানো মানে বিশাল কিছু! এতে আলাদা একটা ভাব আছে!

যা হোক, ল্যাংগুয়েজ ডিসকোর্সের সহজ মানে হচ্ছে- আপনি কারো বলা কথা বা উক্তিগুলোকে নিয়ে, এনালাইসিস করে নানানভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবেন। তো গত দুই দিনে এডিসি হারুন সম্পর্কে ডিবির হারুন এবং এডিসি সানজিদা এই দুইজন গতকাল দুটো বক্তব্য দিয়েছে। আমি তাদের বক্তব্যে ব্যাবহার করা কিছু শব্দের  ব্যাখ্যা করি বরং।

ডিবির হারুন প্রথমেই বলেছেন- ‘তিনিও তো সরকারি চাকরি করেন। তিনি কেন পুলিশের গায়ে হাত তুলবেন। তিনি তো আমাদের জানাতে পারতেন। পুলিশের গায়ে হাত কেন তিনি তুলতে গেলেন?’

পুলিশের একজন বড় কর্তা বারবার করে বলছেন, পুলিশের গায়ে হাত তুলেছে। এর মানে কি? পুলিশের গায়ে হাত তোলা যাবে না। কিন্তু অন্যদের গায়ে হাত তোলা যাবে? আপনি তো বলতে পারতেন- একজন নাগরিকের গায়ে হাত তুলেছেন। কারণ এডিসি হারুন সেখানে কাজ করতে যান নাই। তিনি কর্তব্যরত অবস্থায় ছিলেনও না। অথচ সর্বক্ষণ বলে গেলেন- পুলিশের গায়ে হাত তুলেছে। এর মানে কি? একজন পুলিশ বাসায় ঘুমালেও পুলিশ! বাজারে গেলেও পুলিশ। আবার হাসপাতালে অভিসারে গেলেও পুলিশ!

এরপর ডিবির হারুন বলেছেন- ‘মূল ঘটনা তো থানায় ঘটেনি। ঘটনা ঘটেছে হাসপাতালে। সেখানে এডিসি হারুনের গায়ে হাত তোলা হয়েছে।’

এর মানেটা আসলে কি? দেশের প্রতিটা মানুষ দেখলো একটা ছেলেকে মেরে দাঁত পর্যন্ত তুলে ফেলা হয়েছে। সেটা আপনার কাছে কোন ঘটনা না? ঘটনা হচ্ছে- এডিসি হারুনের গায়ে হাত তোলা! এর মানে কি- আপনারা পুলিশরাই শুধু মানুষ?।

এইবার আসি এই যুগের লাইলী, মানে এডিসি সানজিদার বক্তব্যে। তিনি বারবার করে বলছিলেন- ‘আমার শরীর খারাপ লাগছিল। এই জন্য হাসপাতালে গিয়েছি। কিন্তু সেখানে ডাক্তার না থাকায় স্যারকে ফোন করে বললাম কিছু করা যায় কিনা। এরপর স্যার এসে ব্যবস্থা করলেন।’

মানে কি? দেশে কি হাসপাতালগুলোতে ‘স্যার’রা গেলেই ব্যবস্থা হয়ে যায়? তাহলে আমরা সাধারণ নাগরিকরা কোথায় যাব? আমাদের তো কোন স্যার নেই।

এরপর তিনি বললেন- ‘আমি ছিলাম ইটিটি রুমে। সেখানে আমার কাপড়ের ঠিক ছিল না। সেখানে কোন পুরুষের ঢোকার কথা না। হঠাৎ দেখি আমার স্বামী রুমের ভেতরে।’

ভাইরে, এমন একটা রুমে আপনার স্বামী ওমনি গিয়ে ঢুকে পড়লো বাংলা সিনেমার নায়কের মত? অবশ্য তিনিও তো একটা বড় সরকারি কর্তা। আপনাদের জন্য সকল কিছুই খোলা। চাইলে ঢুকান-বের করেন। এইসবে আপনাদের কিছু যায় আসে না। আমরা সাধারণ জনগণ ঢুকতেও পারি না। বেরও হতে পারি না!

সবশেষে ডিবির হারুনের বক্তব্যে আবার ফিরে যাই। তিনি বলছিলেন- ‘আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়েছি। ওরা আমার ছোট ভাই। ওরাও মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে। আমি দেখি কি করা যায়!’

এর মানে কি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই হলে কি আলাদা ফায়দা? আপনাকে কি আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে রাখা হয়েছে আপনার ছোট ভাইদের দেখভাল করার জন্য? দেশের তো আরো শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কোটি কোটি মানুষ আছে। তারা কি আপনার কাছে যেতে পারে? তাদের জন্য কি আপনি ‘দেখেন’- কি করা যায়?

তো এই হচ্ছে আমাদের সিস্টেম। দুটো সাধারণ বক্তব্যের ভাষা এবং শব্দগুলো ব্যাখ্যা করলেই বুঝে যাবেন- এই দেশের বড় কর্তাদের মানসিকতা কেমন এবং আমরা কোন সিস্টেমে বাস করছি।

লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

সর্বশেষ নিউজ