রাতে হাতিরঝিল এলাকার যে ভয়ংকর রূপ

কামরুল হাসান
spot_img
spot_img

হাতিরঝিল থানার ওসি আমার ফোন ধরলেন না। একটু পরে কলব্যাক করে খুব বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন, কেন ফোন করেছিলাম। আমি তাঁকে আগের রাতের ঘটনার কথা বললাম। তিনি বেশ মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনলেন এবং ব্যবস্থা নেবেন বলে জানালেন। এই ওসির সঙ্গে আমার কোনো জানাশোনা নেই। আমাদের ‘চারা’ ক্রাইম রিপোর্টার শাহরিয়ার বললেন, তাঁর নাম আওলাদ হোসেন মামুন। ওসির কথা শুনে আমার মন ভালো হয়ে গেল, যেরকম ভালো মন নিয়ে গেল রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম।

আজকের পত্রিকার সিটি এডিশন ছেড়ে বনশ্রীর অফিস থেকে আমি আর বার্তা সম্পাদক ফারুক হোসেন  গাড়িতে করে ইস্কাটনের বাসায় ফিরছিলাম রাতে। রামপুরা ইউলুপ থেকে আমরা যখন হাতিরঝিলে নামছি, দেখি মোড়ের মুখে ছোট একটি জটলা। কম বয়সের দুটি ছেলে-মেয়েকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরে তিন যুবক জেরা করছে। মেয়েটি একবার জটলা ভেঙে বেরিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু যুবকেরা কিছুতেই তাকে যেতে দিচ্ছে না। ওই যুবকদের পরনে দারোয়ান বা নিরাপত্তাকর্মীর মতো পোশাক। বাদলকে বললাম, এরা মনে হয় বিপদে পড়েছে।

এরপর ওদের কাছাকাছি হতেই গাড়ির জানালা খুলে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই ছেলে-মেয়েরা তোমাদের লিফট চাই? আমার কথা শুনে যেন প্রাণ ফিরে পেলে ওরা। দৌড়ে এসে দুজনে গাড়িতে বসল, মেয়েটি ড্রাইভারের পাশে আর ছেলেটি আমার পাশে। গাড়িতে বসে ছেলেটি কাঁপছে, যেন ভয়ংকর কোনো বিপদ থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে।

ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। এবার গাড়ির কাছে তেড়ে এল সেই তিন যুবক। একজন  কৈফিয়ত চাইল, তাদের কেন গাড়িতে তোলা হলো। একজন দাবি জানাল, মেয়েটিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে হবে। আরেকজন, আমাকে লক্ষ্য করে খিস্তি করতে লাগল। আমি ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি টান দে।

হাতিরঝিলের রাস্তায় চলতে চলতে দুজনের কাছে জানতে চাইলাম কী হয়েছিল? ওরা বলল বনশ্রীর এক বন্ধুর বাসা থেকে তারা মিরপুরের বাসায় ফিরছিল। কিন্তু রামপুরা ব্রিজে এসে দেখে কোনো গাড়ি নেই। রাত তখন একটা। দুজনে ভেবেছে হাতিরঝিলের মুখে দাঁড়ালে কারওয়ান বাজারের গাড়ি পাওয়া যাবে। মোড়ে আসার পরপরই সেই তিন যুবক তাদের ঘিরে ধরে আজেবাজে কথা বলতে শুরু করে। মেয়েটি কয়েকবার বলল, ‘ওরা আমাকে হ্যারাস করেছে’। আমি বললাম, এখন আর ভয় নেই। মগবাজার মোড়ে এসে ওদের নামিয়ে দিয়ে বললাম, এখান থেকে মিরপুরে যাওয়ার সিএনজি পাবে। নেমে যাওয়ার সময় মেয়েটা বারবার ধন্যবাদ দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তার বিস্ফোরিত চোখ দেখে মনে হলো সে খুবই ভয় পেয়েছে অথবা অপমানিত হয়েছে।

মগবাজার থেকে এবার আমরা ইস্কাটনের গলিতে ঢুকছি। একটু পরে বাদলও নেমে গেল। গাড়িতে আমি একা।

আমি জানি, এই মেয়েটি কাল আবার পথে নামবে। তারপর আবারও অপমানিত হবে। বাসের হেলপার অযাচিত ঘষা দেবে, খুচরো পয়সা না থাকার অজুহাত তুলে খিস্তি করবে রিকশাচালক। বাড়তি ভাড়া নিয়ে সিএনজি বা ট্যাক্সিচালকের কাছে অপমানিত হতে হতে সেদিনও বাড়ি ফিরবে। পরের দিন আবার পথে নামবে, আবারও অপমানিত হবে। এভাবে প্রতিদিনই পুড়ে পুড়ে খাক হবে। সোনা যেভাবে খাঁটি হয়, সেভাবে বড় হবে আমাদের সন্তানেরা।

 তারপর? ‘আমরা কি তার মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারব?’

লেখক: সাংবাদিক

সর্বশেষ নিউজ