২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার
--বিজ্ঞাপন-- Bangla Cars

নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগে কিছু মানুষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দুদকের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু’র নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের পরেই কিছু অতি উৎসাহী লোক ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। ভাবটা এমন যে, সবাই নতুন করে সংবিধান পড়া শুরু করেছে। মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু’কে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন এবং নিয়োগের আগেই কর্তৃপক্ষ অবশ্যই সংবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছেন। কোথাও কোন ধরণের ঘাটতি থাকলে আগে তারা বিকল্প চিন্তা করতেন।

ফলে এ নিয়ে নতুন করে যারা বিতর্ক তৈরি করছেন তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই করছেন বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেছেন, দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচিত হওয়া একদম সম্পূর্ণভাবে বৈধ। এক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, উচিতও না। আমার মতে যে প্রশ্ন করা হচ্ছে, সেটা অবান্তর।

বুধবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এসব কথা বলেন।

যুক্তি হিসেবে তিনি সংবিধানের ৪৮, ৬৬ ও ১৪৭ অনুচ্ছেদ তুলে ধরেন। এসব অনুচ্ছেদ মিলিয়ে পড়লে দেখা যাবে, এটা কোনোভাবেই লাভজনক পদের মধ্যে পড়ে না। রাষ্ট্রপতি কেনোক্রমেই সরকারের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি নন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচারপতি সাহবুদ্দীন আহমদ যখন রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তখন এটাকে লাভজনক পদ উল্লেখ করে রিট করেছিলেন একজন আইনজীবী। সে রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট স্পষ্টত কতগুলো ঘোষণা দিয়েছেন। যার মধ্যে অন্যতম এটা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তা নন।

এদিকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য মো. সাহাবুদ্দিনের কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির প্রশ্নে যদি এ ধরনের অবান্তর বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়, সেটি হবে অনাকাঙ্ক্ষিত। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে তিনি এসব কথা বলেন।

সিইসি বলেন, গত ১২ তারিখে আমরা রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছিলাম। সংসদের দুজন মাননীয় সদস্য প্রস্তাবক এবং সমর্থন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী তাতে সম্মত হয়ে তার স্টেটমেন্ট দিয়েছেন।

সিইসি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সংবিধান, সহায়ক আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আমাদের নির্বাচনটি পরিচালনা করতে হয়। বাছাইয়ের কাজটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার তথা নির্বাচনী কর্তার একক এবং অবিভাজ্য। এটি কমিশনের কোনো দায়িত্ব ছিল না। দায়-দায়িত্ব, ভুলভ্রান্তি সবকিছুর দায়ভার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এককভাবে নিতে হবে।

একটি প্রশ্ন উঠেছে যে, প্রার্থীর সাংবিধানিক বা আইনগত অযোগ্যতা রয়েছে। এটা সত্য যে দুদক আইনে ৯ ধারায় বলা হয়েছে, কর্মাবসানের পর কোনো কমিশনার প্রজাতন্ত্রের লাভজনক কোনো পদে নিয়োগ লাভে যোগ্য হবেন না। এটা আছে। এটার আলোকে বিষয়টি বিবেচ্য। এতে করে অনেকে বলতে চেয়েছেন, রাষ্ট্রপতির পদটি একটি লাভজনক পদ।

‘আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচনী কর্তা হিসেবে ওই রায়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলাম। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে, প্রার্থী যাই বলুক, কমিশনারেরও দায়িত্ব আছে বাছাই করে দেখার। আমরা দেখলাম, আইনগত কোনো অযোগ্যতা নেই। ৯ ধারায় (দুদক আইনের) বলেছে, কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভে যোগ্য হবেন না। আমরা কিন্তু এখান থেকে প্রার্থীকে নিয়োগ দান করিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দান করেননি। প্রধান বিচারপতিও নিয়োগ দান করেননি। কেউ নিয়োগ দান করেননি এবং কেউ নিয়োগ দান করতে পারেন না। উনি নির্বাচিত হয়েছেন। আইন তাকে নির্বাচিত করেছে প্রচলিত প্রথা অনুসরণ করে।’

সিইসি বলেন, আমাদের নির্বাচন এবং নিয়োগের মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। তাকে যদি এখান থেকে নিয়োগ দান করা হতো তাহলে সেটি অবশ্যই অবৈধ হতো। কারণ নিয়োগ দানের কর্তৃপক্ষ বা কর্তৃত্ব আমাদের নেই, কারোই নেই।

‘অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ যখন রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই বিষয়ে রিট মামলা হয়েছিল। সে মামলায় বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, শাহাবুদ্দীন আহমেদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পূর্ণ বৈধ। এতে কোনো অবৈধতা হয়নি। পদটি অফিস অব প্রফিট হলেও এটা অফিস অব প্রফিট ইন দ্য সার্ভিস অব দ্য রিপাবলিক নয়।’

সিইসি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত একটি রায় বলে দিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি যেমন, ঠিক তেমনি একজন অবসরপ্রাপ্ত দুদকের কমিশনার রাষ্ট্রপতি পদে কোনোভাবেই অবৈধ নন। সেদিক থেকে এই প্রশ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি, বিভিন্ন ধরনের মতামত দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি অনাবশ্যক বা সমিচিন হবে না বলে আমি মনে করি। আমি আপনাদের মাধ্যমে বলতে চায়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির প্রশ্নে যদি এ ধরনের অবান্তর বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়, সেটি হবে অনাকাঙ্ক্ষিত।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন নির্বাচিত হয়েছিলেন, নিয়োগপ্রাপ্ত হননি।

সাংবিধানিক পদে নির্বাচন কমিশনাররাও রয়েছেন। তারা অবসরে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে বাধা থাকছে কি না, জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আমাকে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দেখেন, তখন আমি দেখবো সেটা গ্রহণ করতে পারবো কি পারবো না।

নির্বাচন করতে পারবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি নির্বাচন করতে পারবো। আমার ব্যক্তিগত মত। সেই ক্ষেত্রে ওখানে যদি বলে আমি নিয়োগের অযোগ্য, তাহলে আমি একটি যুক্তি নিতে পারি যে, আমি নিয়োগের অযোগ্য কিন্তু নির্বাচনের অযোগ্য নই।

অপরদিকে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু’র নিয়োগ নিয়ে কিছু লোক অকারণেই চায়ের কাপে ঝড় তুলছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দুদককেও বেহুদা বিতর্কিত করতে চাচ্ছে তারা।

বুধবার দুপুরে এইদিন এইসময়কে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

গোলাম রহমান বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা ভিত্তিহীন। এই বিষয়টি নিয়ে বিবেচনা ও যুক্তিসংগত মন্তব্য করছেন না অনেকেই।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মো. সাহাবুদ্দিনকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি এইদিন এইসময়কে বলেন, দুদকে তিনি আমার সহকর্মী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। তাঁর নিয়োগ যেটা হয়েছে তাতে নিয়মের ব্যত্যয় হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

নির্বাচনের পর তাঁর নির্বাচন আইন সম্মত হয়েছে কিনা যোগাযোগ মাধ্যমে সে প্রশ্ন তুলে কেউ কেউ চায়ের কাঁপে ঝড় তোলার চেষ্টা করছেন।

কিছু পদকে সংবিধানে ‘লাভজনক পদ’ নয় বলা আছে। ‘রাষ্ট্রপতি’-র পদ তার অন্যতম। সংবিধানের ধারা ১৪৭ (৩)(৪) দেখার অনুরোধ করছি। অনুরূপ প্রশ্নে ইতোপূর্বে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচন উঁচ্চ আদালতে বৈধ বিবেচিত হয়েছে। অতএব, প্রশ্নটি ভিত্তিহীন বিবেচনা করা যুক্তিসংগত হবে।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী হওয়ায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক দুর্নীতি দমন কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন সিইসি। দুদক আইনে কমিশনার কর্মবসানের পর প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ পাবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই নিয়েই বিভিন্ন মহল থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

সর্বশেষ নিউজ