২০ জুলাই ২০২৪, শনিবার

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা : আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

কুবি প্রতিনিধি
spot_img

লালমাটির ক্যাম্পাস বলে খ্যাত দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের অঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীট কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৬ সালের ২৮ মে ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পদচারণে। প্রায় সব বিভাগ থেকে সব জেলার শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি এ দ্বারা অব্যাহতি থাকলেও গুচ্ছের কারণে এখন তা হারাতে হচ্ছে। ফলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় হারাচ্ছে নিজস্ব স্বকীয়তা পরিণত হচ্ছে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।

২০২০-২০২১ সেশনে দেশ সেরা ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে সঙ্গে নিয়ে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি শুরু হয়। দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২২।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই বৃহত্তর কুমিল্লার। ফলে দিনে দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা পরিবর্তন করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এছাড়া অব্যবস্থাপনা, ভর্তি বিড়ম্বনা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটোছুটি ও অতিরিক্ত খরচসহ পদে পদে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে এখনও আসন ফাঁকা ৭০টি। তবে ফাঁকা আসনের সংখ্যা বাড়তেও পারে বলে আশঙ্কা অনেকের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, পদার্থ বিভাগের ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার ৪৩ জনের মধ্যেই ৩৬ জনের বাড়িই বৃহত্তর কুমিল্লা। অর্থাৎ কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরের শিক্ষার্থী। যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৮০ শতাংশের মতো। একই চিত্র ইংরেজি, প্রত্নতত্ত্ব, গণিত এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগেও। ইংরেজি বিভাগে উপস্থিত হওয়া ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৮ জন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ২৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১২ জন, গণিত বিভাগের উপস্থিত ৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৭ জন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২৮ জনেরমধ্যে ১৮ জন বৃহত্তর কুমিল্লার। শুধু এসব বিভাগেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগেই প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কুমিল্লা অঞ্চলের। ফলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বিনিময়ের বড় বাধা বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বইয়ের পড়া চেয়ে দেখাশুনার মাধ্যমে শেখা বেশি হয়। এখানে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা আসবে, তারা একে অপরের সংস্কৃতি দেখে শিখবে। বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিচিত্রতা থাকবে, কিন্তু গুচ্ছের কারণে তা হারিয়ে গেছে। নতুন শিক্ষাবর্ষে আমি প্রত্যেক বিভাগ পরিদর্শন করছি। সেখানে দেখেছি ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃহত্তর কুমিল্লার। যা একটা সাধারণত কলেজে দেখা যায়।

ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দফতরের পরিচালক ড. মোহা. হাবিবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো কলেজ না। এখানে ৬৪ জেলার শিক্ষার্থী পড়তে আসবে। কিন্তু গুচ্ছের কারণে তা হারিয়ে গেছে।

এদিকে গুচ্ছের কারণে ভোগান্তি কমার বদলে বেড়েছে বলে মন্তব্য করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসা এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, এখন শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে। কোন বিষয়ে পড়াশোনা করবে। পছন্দের বিষয় পেতে মাইগ্রেশন করে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে, এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ যেমনব্যয় হচ্ছে, ভর্তি হতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতায়ও পড়তে হচ্ছে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সানজিদা কানন বলেন, শিক্ষার্থীদের হয়রানি কমানোর জন্য গুচ্ছ পরীক্ষা চালু করা হলেও হয়রানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গুচ্ছভুক্ত পরীক্ষারপরবর্তী প্রক্রিয়া আমাদেরকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। যেখানে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নভেম্বরে ক্লাস শুরু হয়েছে সেখানে গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাস ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছে। একই সেশন হওয়া সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

ভোগান্তির বিষয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, গুচ্ছ ভালোর চেয়ে খারাপই হচ্ছে। আমরা শিক্ষকরা গুচ্ছের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এখন হিতে বিপরীত হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে গুচ্ছনিয়ে ভাবার সময় এসেছে। না হলে আবারও স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে চালু হোক।

গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন, বর্তমানে গুচ্ছ পদ্ধতি উচ্চ শিক্ষার অন্তরায়। গুচ্ছের কারণে এখনো ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

তবে গুচ্ছের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন জানান, গুচ্ছের আগেও এখানে শিক্ষার্থীদের চিত্র একই। এখানকার শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীও কুমিল্লার। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও যেহেতু গুচ্ছতে থাকছে আমরাও থাকব।

উল্লেখ্য, শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নয় গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার কারণে গুচ্ছভুক্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হচ্ছে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। হারাচ্ছে নিজস্ব স্বকীয়তা।

সর্বশেষ নিউজ