বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিন ‘মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিন

ফারহানা সুমনা
spot_img
spot_img

দীর্ঘদিনের দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট বাজারে দ্রব্যমূল্যের বর্তমান যে অবস্থা, বছরের পর বছর ধরে চলমান, এর মূল কারণ বাজার সিন্ডিকেট এবং চরম অনিয়ম। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে।

দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি। সাধারণ মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সহজলভ্যতা চায় এবং তাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে দেখতে চায়। সরকার অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এর লক্ষ্যে কাজ শুরু করলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো সংস্কার কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।

এখনো বাজার সিন্ডিকেট ভাঙছেনা কেন—এ প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। গত ১অক্টোবর এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তাফা ভুঁইয়া বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের বিদায়ের পর সিন্ডিকেটের প্রভাব কমার কথা। কিন্তু আমরা এখন কী দেখছি! বাজার সিন্ডিপকেটের হাতে বন্দি হয়ে গেছে।

দ্রব্যমূল্য সহনীয় করতে বাজার ব্যাবস্থাপনা ও মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রন করতে বাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমরা আপোস করবো না—বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড.সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি আরও বলেন, এর জন্য অপরাপর সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের সংগে আলাপ আলোচনা করেই তা করবো। কারন বাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কৃষি মমন্ত্রনালয়, পরিবহন সংস্থা হিসেবে সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়, আমদানি সংস্থা হিসেবে বানিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন ধরনের শুল্ক সংস্থা হিসেবে অর্থমন্ত্রণালয় তথা এনবিয়ার ও খাদ্যমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি মনে করেন পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ, মজুদ,বাজার পরিস্থিতিসহ মূল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোসহ দাম সহনীয় রাখতে ভোজ্য তেল, খাদ্যপণ্য আমদানির কথা জানান।

সিন্ডিকেট আসলে কি:
এ সম্পর্কে ধারণা আমাদের ধারণা কতটা পোক্ত?
সাধারণত ব্যবসাখাতে সিন্ডিকেট বলতে কিছু ব্যাবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যকার জোট বাঁধাকে বোঝায়।
সিন্ডিকেট গঠনের ফলে সৃষ্ট গোষ্ঠী ক্ষমতা অনেক সময় বাজার-ব্যবস্থার কল্যাণমুখী অবদানকে খর্ব করে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অস্থিতিশীল বাজারে,বিশেষত বাজার দাম বৃদ্ধির প্রধানতম কারন হিসেবে সিন্ডিকেট প্রথায় দায়ী।

দেশে চাল, ডাল, তেল,পেঁয়াজ রসুন,চিনিসহ নিত্যপণ্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে বড় কয়েকজন হাতেগোনা ব্যাবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে দেশে উৎপাদিত দ্রব্য কমমূল্যে কিনে , উচ্চমূল্যে বিক্রির বিষয়টি নির্ধারণ ও নিশ্চিত করছে এ সিন্ডিকেট।।

সিন্ডিকেটের সদস্যরা কম মুল্যে দ্রব্য কিনে অধিক মুল্যে বিক্রির বিষয়টি নির্ধারণ করে দেয়। ফলে প্রান্তিক চাষির যেমন খাবার জোটে না তেমনি সিন্ডিকেটের সদস্যদের বাজার নিওন্ত্রক সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পুলিশ,র‍্যাব গোয়েন্দা সংস্থা, সিটি কর্পোরেশন, মাঠ প্রশাসন, কৃষি বিপনন অধিদপ্তর—সবাই এতদিন ধরে চিনে এসেছে,কিন্তু কেউ কিছু বলেনি।

গত পনেরো বছরে আমার বেতন ডবল (দ্বিগুন)
বেড়েছে। এতে তো আমার দিন ভালো যাওয়ার কথা।কিন্তু না। অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ। বেতন এক টাকা বাড়লে জিনিস পত্রের দাম বাড়ে পাঁচ টাকা।
আগে মাসের খরচ চালিয়ে পকেটে কিছু থাকতো।এখন বেতনেই চলে না। উল্টো ঋণ করতে হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাইম আহমেদ এভাবেই আক্ষেপের স্বরে বলছিলেন,তার পরিস্থিতিতির কথাগুলো।

স্বৈরাচার সরকার ২০০৯ সালের শুরুতে ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে পরপর তিন মেয়াদে গত ১৫ বছর সরকার পরিচালনা করে আসছে। ডামি ভোটে চতুর্থ মেয়াদে পা রাখার ছয় মাসের মাথায় পতন ঘটে। তারা প্রতিবার‌ই নির্বাচনী ইশতেহারে জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে রাখার অঙ্গিকার করেছিল। কিন্তু তা ছিল জনগনের সঙ্গে এক ধরনের প্রহসন।
এই দেড় দশকের শাসনামলে বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুন।

২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত কিছু পণ্যের দামের হিসাব বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, কি পরিমাণ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এতগুলো বছরে। চালের দাম ২০০৯ থেকে পরবর্তী কয়েক বছর থেকে ২৮ টাকার মধ্যে ছিলো।
২০১৪ সালে ৩৭ টাকার মধ্যে,২০১৯ থেকে আবার বেড়ে ৪৯টাকা১১পয়সায় দাঁড়ায়। এখন মোটা চালের দাম এই পর্যায়ে ঠেকেছে। চিকন বা সরু চালের দাম ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিগত পাঁচ বছরে মোটা চালের বেড়েছে ৫৬ শতাংশের চেয়ে বেশি। যা নিন্ম আয়ের মানুষকে থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত স্পর্শ করেছে।

মসুরের ডালের দাম কয়েক বছরের ব্যবধানে ১১১টাকা থেকে বেড়ে বর্তমান কেজি প্রতি ১২০ থেকে ১৫০টাকার মধ্যে দাঁড়িয়েছে। সিপিডির তথ্য মতে,গত পাঁচ বছরে মসুর ডালের দাম বেড়েছে ৯৫ শতাংশ।

আলুর দাম ২৫থেকে ২৬ টাকা থেকে বেড়ে কয়েক বছরে দাঁড়িয়েছে ৬৫থেকে ৭০টাকায়। ২০১১ সালে কেজি ছিল ১৪টাকা, ২০১৪—২০১৯ পর্যন্ত ২১টাকা।
২০১৯ সালে দাম বেড়ে হয় ৩০—৩২ টাকা।
২০২৩ সালের শেষের দিকে আলুর দাম রেকর্ড পরিমান বেড়ে কেজি প্রতি ৬৫ টাকা। তখন সরকার ৩৫ টাকা কেজি প্রতি দর বেধে দেয়। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি।

ডিম এর দামের দিকে তাকালে দেখতে পাই,২০০৯ সালে হালি প্রতি মূল্য ছিল ২৮ থেকে ৩০টাকা।
২০১৪ সালে হালি ৩০ থেকে বেড়ে ৪২টাকা হয়।
২০২৩ সালে হালি প্রতি ৫৮-৬০ টাকা। আর বর্তমানে ডিম কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকা হালি।

এবার দেখি গরুর মাংসের দাম কীভাবে বাড়ল।
২০০৯ সালে কেজি ছিল ৪৫৯-৫১১ টাকা।
২০১৪ সালে ৬০০টাকা,বর্তমানে কেজি ৭৮০—৮০০ টাকায় কেজি বিক্রি হচ্ছে।

অর্থাৎ, বিগত বছরগুলোতে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। সে তুলনায় মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি। বরং সংকুচিত হয়েছে মেন্যু।

দ্রব্যমুল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ৩টি বিষয়ে নজর দিতে হবে।
১.উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের মূল্য কম হওয়া।
২.আমদানি বাড়িয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো। কিন্তু ডলার সংকটে ব্যাবসায়ীরা এলসি খুলতে পারছেন না। ডলারের বাড়তি দামের কারনেও খরচ বেড়েছে। ২০২২ সালের মে মাসের দিকে দেশে ডলারের দাম ছিলো ৮৬ টাকার আশপাশে।এখন আমদানিতে নির্ধারিত দর ১১০ টাকা। যদিও ব্যাবসায়ীরা বলছেন, আমদানির ক্ষেত্রে ডলার কিনতে তাঁদের ১২৪ টাকা লাগছে।ফলে এ সময়ে শুধু ডলারের দামের কারনে পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৪৪শতাংশ।এর দিকে নজর দিতে হবে সরকারকে।
৩.কিছু কিছু পণ্যে উচ্চ হারে শুল্ককর রয়েছে।সেখানে ছাড় দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া।

বড় কথা হচ্ছে, সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যাবস্থাপনার কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে
সিন্ডিকেট ব্যাবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।আমদানিকৃত পন্যের শুল্ক কমানোসহ পরিবহন ব্যাবস্থাপনা ও বাজার ব্যাবস্থাপনায় চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব হলে দ্রব্যমুল্যের দাম মানুষের সাধ্যের মধ্যে আসবে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে,জুলাই আন্দোলনে এদেশের ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছেন। তারা বিগত সরকারের লুটপাট, সিন্ডিকেট, দুর্নীতি, ভোটাধিকার হরণসহ শত কারণে তারা বুক পেতে রক্ত দিয়েছে। আজ তাদের জন্য হলেও বাজার সহনশীল ও সহনীয় করা জরুরি

সর্বশেষ নিউজ