আয়নাঘরের অবস্থান নিশ্চিত করা হয় গণ অভ্যুত্থানের পর পরই।কিন্তু আয়নার ঘর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এখতিয়ার ভুক্ত রাখা হয়।অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারী বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শন করেছেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগীদের কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধী মতের বহু মানুষকে তুলে নিয়ে বিচার বহির্ভূতভাবে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখার অভিযোগ ওঠে। সেইসব বন্দিশালার প্রতীকী নাম রাখা হয়েছে ‘আয়নাঘর’।
গত জুলাই আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর মানুষের সামনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো আয়নাঘর।
সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে তৎকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক নির্যাতনের অভয়ারণ্য।
এই অভয়ারণ্যে কত মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন, মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছেন তার কোনো ইয়াত্তা নেই।
গুটিকয়েক যে কিছু মানুষ ফিরে এসেছেন তাদের কাছেও আয়নাঘরের উপস্থিতি জানা ছিলো কিন্তু অবস্থান সম্পর্কে ধারণা ছিলনা।
আয়নাঘর পরিদর্শন করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গত সরকার আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের একটা নমুনা প্রতিষ্ঠা করে গেছে।’আয়নাঘরে খাঁচার মতো জায়গায় যেখানে বন্দিদের আটকে রাখা হতো সেসব জায়গা ঘুরে দেখেন প্রধান উপদেষ্টা।
এসময় তিনি বলেন, ‘আমাকে নতুন করে বলতে হবে না। বর্ণনা দিতে গেলে বলতে হয়—আয়নাঘরের ভেতরে খুবই বীভৎস দৃশ্য। এখানে মনুষ্যত্ববোধের কিছু নেই। যা হয়েছে তা নৃশংস।’
আয়নাঘরে যে পরিবেশে মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল তা দেখে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এটা কি আমাদেরই সমাজ? এটার কোনো ব্যাখ্যা নাই। যতটাই শুনি, অবিশ্বাস্য মনে হয়।
যারা নিগৃহীত হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে তারাও আমাদের সঙ্গে এসেছে, তাদের মুখেই শুনলাম। বিনা দোষে কতগুলো সাক্ষী নিয়ে, হাতে এক্সপ্লোসিভ ধরিয়ে দিয়ে কাউকে সন্ত্রাসী-জঙ্গি বলে রাখা হয়েছে।’
বিগত সাড়ে পনেরো বছর ধরে অতি সতর্কতার সাথে যেভাবে আয়নাঘর সৃষ্টি করে নির্যাতন চালানো হয় তা ছিলো সভ্য সমাজের জন্য অকল্পনীয়। আয়নাঘরের এই লৌহমর্ষক গল্পগুলো এখন মিলিয়ে নিচ্ছেন ভুক্তভোগী যারা দীর্ঘদিন আয়নাঘরে বন্দীঅবস্থায় ছিলেন।
আয়নাঘর সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই রকম টর্চার সেল সারা বাংলাদেশ জুড়ে আছে সেটাও শুনলাম আজকে। কতগুলো আছে সেই সংখ্যা কিছু জানা আছে আর বাকিটা অজানা।
গত সরকারের তৈরি করা এসব আজব ধরনের টর্চার সেল দেখে প্রধান উপদেষ্টা বলেন গত সরকার আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের একটা নমুনা প্রতিষ্ঠা করে গেছে। গুম কমিশন এসে এসব উদঘাটন করেছে। দেশের যে চূড়ান্ত অবনতি দেখলাম এইটার তার একটা প্রতিচ্ছবি। মানুষকে সামান্যতম মানবিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এটা জাতির জন্য চূড়ান্ত রকমের ডকুমেন্ট হবে। ভুক্তভোগীদের সংখ্যা আমার জানামতে সতেরশ । অজানায় আরও আছে। এই যে মানুষ উধাও হয়ে গেছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কেউ বলতে পারছে না সে কোথায়। এইগুলো করুণ দৃশ্য। আমরা এই সমাজকে যদি এর থেকে বের করে না আনতে পারি তাহলে আমাদের সমাজ তো টিকবে না।
নতুন বাংলাদেশে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং এই জাহিলিয়াত যেন আর ফিরে না আসে সেইসব কিছু নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন,এইসব যারা করেছে তারা আমাদেরই সন্তান, ভাই। এটা আমাদের সবারই অপরাধ।
মুক্ত বাংলাদেশে আমরা যেন নতুন করে বাংলাদেশ গড়তে পারি এবং যারা করেছে তাদের বিচার করতে পারি নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য।এইসব এভিডেন্স সিলগালা করে রাখা হবে। যাতে বিচারিক কাজে প্রমান হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’
উল্লেখ্য নতুন সরকার শপথ নেয়ার প্রায় ছয় মাসের মাথায় আয়নাঘর পরিদর্শন করলেন প্রধান উপদেষ্টা সহ আরও কিছু উপদেস্টা ভুক্তভোগী কয়েকজন ও কিছু গণমাধ্যম কর্মীও উপস্থিত ছিলেন এসময়।
(এএ/ ফারহানা সুমনা)

