ছয় বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছিলেন নুরুল হক নুর। ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি বা ভিপি পদে জয়ী হয়ে আলোচনার তুঙ্গে আসেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে ১,৯৩৩ ভোট বেশি পেয়ে ২৮তম ভিপি নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর। তিনি পান ১১,০৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পান ৯,১২৯ ভোট।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই রেকর্ড ভেঙে আরও বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থী সাদিক কায়েম। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পেয়েছেন ১৪,০৪২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের মো. আবিদুল ইসলাম খান পান মাত্র ৫,৭০৮ ভোট। ফলে জয় নিশ্চিত হয়েছে ৮,৩৩৪ ভোটের বিশাল ব্যবধানে, যা নুরের সময়কার ব্যবধানকে পুরোপুরি ছাড়িয়ে গেছে।
নুরুল হক নুর ছাত্ররাজনীতিতে বিকল্প নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেন। তবে সর্বশেষ নির্বাচনে সাদিক কায়েম শুধু ভোটসংখ্যায় নয়, ব্যবধানের দিক থেকেও নুরকে ছাপিয়ে গেছেন। অনেকের মতে, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী বড় সংগঠনগুলোর বাইরে থেকেও বৃহৎ ভোটব্যাংক গড়ে তোলা সম্ভব।
২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর প্রার্থী হিসেবে ভিপি নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর। এটা ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা, কারণ ছাত্রলীগ দীর্ঘ এক দশক ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তখন প্রশ্ন উঠে-এটা কি শুধুই নুরের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক দর্শনের জয়? বাস্তবে, নুরের জয় ছিল বহুমাত্রিক।
একদিকে ব্যক্তিগত সাহস, আন্দোলনে দৃঢ় উপস্থিতি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছিল তার শক্তির জায়গা। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি শাসনামলে ছাত্রলীগের ওপর জমে থাকা ক্ষোভ। নির্যাতিত-নিপীড়িত ছাত্রছাত্রী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নুরকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তাই বলা যায়, নুরের বিজয় ছিল আংশিক তার ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল, তবে বড় অংশে এটা ছিল সরকারবিরোধী চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন মূলধারা রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে জড়িত। এই নির্বাচনকে বড় দলগুলো নিজেদের কর্তৃত্ব রক্ষার ইমেজ হিসেবে দেখে। জাতীয় দলগুলোর পক্ষ নিয়েই তারা নির্বাচনে অংশ নেন। এটি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের জন্য লিটমাস টেস্ট হয়ে দেখা দেয়। তবে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধীদের প্যানেল জয়ী হয়। যদিও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় ২০০৮ সালের পর সেই পরিস্থিতিও পাল্টে যায়। স্থানীয় পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় নির্বাচনের ফলাফল তারা নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয়।
এবারের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে সেই পুরোনো ধারা ভেঙে ইতিবাচক কিছু ঘটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকার কোন দলকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এতে করে দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে ভালো কিছু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

