তালা না খুললে নিজেই ভাঙব, আপনি আর বেশিদিন নাই’—রাবিতে প্রাধ্যক্ষকে হুমকি দিল ছাত্রদল নেতা

ন্যাশনাল ডেস্ক
spot_img
spot_img

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর আবাসন সংকট নিরসনে যখন নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই এক হল প্রাধ্যক্ষকে মুঠোফোনে সরাসরি হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রদলের শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষকে কোনো তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে কক্ষে অনাবাসিক ছাত্র ওঠানো এবং পরবর্তীতে ওই কক্ষে প্রাধ্যক্ষ তালা ঝুলিয়ে দিলে তা ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।

এই ঘটনায় অভিযুক্ত লতিফ হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মুরাদ হোসেন সরাসরি হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আতাউল্লাহকে আধা ঘণ্টার আলটিমেটামসহ “আপনি আর বেশিদিন নাই” বলে হুমকি দেন। পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা এড়াতে কর্মচারীদের দিয়ে সাময়িকভাবে তালাটি খুলিয়ে দিতে বাধ্য হন হল প্রাধ্যক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরের এই ঘটনাটি আজ বুধবার (২০ মে ২০২৬) ক্যাম্পাসে জানাজানি হলে সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

‘আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দিলাম’: ফোনালাপের বিবরণ

হল প্রশাসন ও ভুক্তভোগী প্রাধ্যক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রাধ্যক্ষের কোনো অনুমতি বা সিট বরাদ্দ ছাড়াই দুই অনাবাসিক ছাত্রকে হলের ১৫৮ নম্বর কক্ষে তোলেন ছাত্রদল নেতা মুরাদ। বিষয়টি জানতে পেরে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আতাউল্লাহ ওই দুই ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অফিসে ডাকেন। কিন্তু তারা প্রাধ্যক্ষের অফিসে না গিয়ে রুমে তালা দিয়ে হলের বাইরে চলে যান। এরপর প্রাধ্যক্ষের নির্দেশে হলের কর্মচারীরা সেই কক্ষে আরেকটি ‘অফিসিয়াল’ তালা লাগিয়ে দেন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আতাউল্লাহ বলেন, “কাল দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে আমার মোবাইলে কল আসে। ওপাশ থেকে একজন বলল, ‘স্যার, আমি মুরাদ বলছি, লতিফ হল ছাত্রদলের সভাপতি। আপনি ওই রুমে তালা দিয়েছেন, ওই রুমে আমিই ওদের উঠিয়েছি।’ তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, প্রভোস্টের অনুমতি ছাড়া তুমি ছাত্র উঠাতে পারো? সে বলে, ওরা গরিব মানুষ।”

প্রাধ্যক্ষ আরও যোগ করেন, “এরপর সে আমাকে সরাসরি থ্রেড করে বলে, ‘আপনি রুম খুলে দেবেন কিনা এইটা বলেন। আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দিলাম। আপনি তালা খুলে দিলে দেন, নাহলে আমি নিজে গিয়ে তালা ভেঙে ফেলব।’ কথার একপর্যায়ে সে আমাকে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলে, ‘আপনি তো আর বেশিদিন নাই স্যার।’ তখন আমি বললাম, যতদিন আছি, ততদিন তো আমি এই হলের প্রভোস্ট। পরে ক্যাম্পাসে বড় কোনো বিশৃঙ্খলা যাতে না হয়, সেজন্য আমি কর্মচারীদের তালা খুলে দিতে বলি।”

আজ বুধবার সরেজমিনে লতিফ হলের ১৫৮ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বর্তমানে দুইজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। তারা হলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান আপন এবং আরবি বিভাগের জাবিদ।

জানতে চাইলে কামরুজ্জামান আপন দাবি করেন, তাঁর আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় তিনি হলের উপ-রেজিস্ট্রার করিম আলীর কাছে সিটের জন্য আবেদন করেছিলেন এবং করিম আলীই তাঁকে এই ফাঁকা রুমে ওঠার পরামর্শ দেন। আপন আরও স্বীকার করেন যে, তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক নাফিউল জীবনের অনুসারী।

তবে ছাত্রের এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে হলের উপ-রেজিস্ট্রার করিম আলী বলেন, “আমি হলের মধ্যে এক চুল পরিমাণ কিছু করার আগেও সেটা প্রাধ্যক্ষ স্যারকে জানাই। আমি সবসময় অবৈধভাবে থাকা রুম খালি করার চেষ্টা করি। তারা কীভাবে কোনো অফিসিয়াল বরাদ্দ ছাড়া সেখানে আছে, তা আমার জানা নেই।”

উপাচার্য ফিরলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস

এই গুরুতর রাবিতে প্রাধ্যক্ষকে হুমকি দেওয়ার ঘটনার পর লতিফ হল প্রাধ্যক্ষ বিষয়টি প্রাধ্যক্ষ পরিষদকে জানিয়েছেন। প্রাধ্যক্ষ পরিষদের এক জরুরি মিটিংয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “মুরাদ ফোন দিয়েছে, নাকি অন্য কেউ তার নাম ব্যবহার করেছে, তা আমরা কথা বলে জানব। এই নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসন আমাদের কাছে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ করেনি। জানার পরে সত্যতা পেলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক শাহ হুসাইন আহমেদ মাহদী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন যৌথভাবে জানিয়েছেন, মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টনের নীতিতে প্রশাসন অটল। হল প্রাধ্যক্ষ ইতিমধ্যে লিখিতভাবে বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছেন। উপাচার্য বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন; আগামী ২৫ মে তিনি দেশে ফিরলেই এই বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সর্বশেষ নিউজ