বিশেষ প্রতিবেদন: আমলাদের ঢাকা-প্রীতির বলি চট্টগ্রাম, বিপিসি স্থানান্তরের নেপথ্যে কার স্বার্থ?

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
spot_img
spot_img

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় দেশের প্রধান বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের নেপথ্য কাহিনী এবার পুরোপুরি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশের জ্বালানি খাতের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রামে বিপিসির সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানান্তর করা হলেও গত সাড়ে তিন দশকে তা কার্যত নামেই সীমাবদ্ধ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের শীর্ষ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজধানীর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে চান না। আর কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে অনীহা’র মানসিকতাকে পুঁজি করেই এবার শুরু হয়েছে স্থায়ীভাবে সদর দপ্তর ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম ও অতি গোপনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, একটি বিশেষ সংসদীয় নোটিশ এবং তার পরপরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজিরবিহীন ‘বিদ্যুৎ গতির’ চিঠি চালাচালির মাধ্যমে এই আত্মঘাতী স্থানান্তর প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে।

সংসদীয় নোটিশ ও মন্ত্রণালয়ের নজিরবিহীন ‘বিদ্যুৎ গতি’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ মে (২০২৬) কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী একটি জরুরি ও জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ প্রদান করেন। নোতিশে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের প্রকাশ্য আবেদন জানান। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় বিপিসির একটি স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন।

সাধারণত যেকোনো জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ বা প্রস্তাবনার ওপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়, অংশীজন ও স্থানীয় অংশীদারদের সাথে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই, সমীক্ষা ও পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও, বিপিসির ক্ষেত্রে তা ঘটেছে অলৌকিক গতিতে। সংসদ সদস্যের নোটিশ প্রদানের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি আমলে নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। এরপর থেকেই মূলত আড়ালে-আবডালে থাকা স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ ডানা মেলতে শুরু করেছে।

বিপিসি সদর দপ্তর স্থানান্তরের নেপথ্য ঘটনাপ্রবাহ:

প্রধান ঘটনা ও তারিখ ঘটনার বিবরণ ও নেপথ্য ভূমিকা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
৬ মে ২০২৬ (সংসদীয় নোটিশ) এমপি মনিরুল হক চৌধুরী কর্তৃক বিপিসি কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। চট্টগ্রামের মর্যাদা ও গুরুত্বকে আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা।
১২ মে ২০২৬ (মন্ত্রণালয়ের চিঠি) উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান কর্তৃক বিপিসি চেয়ারম্যানকে দ্রুত চিঠি প্রেরণ। যাচাই-বাছাই ছাড়া নজিরবিহীন ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ চিঠি চালাচালির তীব্র নিন্দা।
উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ভবন চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নিজস্ব আধুনিক বহুতল প্রধান কার্যালয়। নিজস্ব স্থায়ী ভবন রেখে ঢাকায় নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাবকে জনগণের টাকার অপচয় ঘোষণা।

৩৫ বছরের ফাঁকি ও ৫০ কোটি টাকার ভবন অপচয়ের ছক

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দিতে এবং দেশের জ্বালানি খাতের মূল অবকাঠামো ও অপারেশনাল এরিয়ার কাছাকাছি রাখতে বিপিসিকে চট্টগ্রামে আনা হয়। কিন্তু গত ৩৫ বছর ধরে সংস্থাটির বড় বড় কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে ঢাকাতেই লিয়াজোঁ অফিস বা অন্য কোনো ছদ্মনাম দিয়ে অবস্থান করে আসছিলেন। সপ্তাহে দু-একদিন অথবা মাঝেমধ্যে লোকদেখানো চট্টগ্রাম সফর করলেও তাদের মূল মনোযোগ ও যাতায়াত ছিল রাজধানী কেন্দ্রিক।

চট্টগ্রামে যখন প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব আধুনিক বহুতল প্রধান কার্যালয় ভবন সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং উদ্বোধনের অপেক্ষায়, ঠিক তখন কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে না চাওয়ার’ মনস্তত্ত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সংসদ সদস্যের এই নোটিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এই অতি-তৎপরতা বলে উল্লেখ করেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক সৈয়দ সগির আহমেদ।

চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র: ফুঁসে উঠেছে নাগরিক সমাজ

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল ও নাগরিক সমাজ এই স্বার্থান্বেষী প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে একে চট্টগ্রামের অর্থনীতির জন্য একটি ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে:

  • স্বার্থের সংঘাত ও বৈষম্য: যেখানে সরকারের মূল ঘোষিত নীতি হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সেখানে মুষ্টিমেয় আমলা ও কর্মকর্তাদের আরাম-আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের স্বার্থে একটি পুরো জাতীয় সংস্থাকে ঢাকায় ফেরত নিয়ে যাওয়া চরম বৈষম্যমূলক ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত।

  • কোটি কোটি টাকার অপচয়: চট্টগ্রামে যখন বিপুল ব্যয়ে নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় প্রস্তুত, তখন আবার ঢাকায় নতুন করে স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকার চরম অপচয় ও লুটপাট ছাড়া আর কিছুই নয়।

  • চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করার নীল নকশা: বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের যে আইনগত মর্যাদা ও গুরুত্ব, তা এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেটের কারণে বারবার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার জন্য দেশের পুরো জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে অপারেশনাল এরিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে শত মাইল দূরে সরিয়ে নেওয়া জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার পরিপন্থী। এই ‘বিদ্যুৎ গতির’ আত্মঘাতী প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করে বিপিসির পূর্ণাঙ্গ সদর দপ্তর সদ্য নির্মিত চট্টগ্রামের স্থায়ী ভবনেই কার্যকর করার দাবি এখন চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ