সিলেটে মহামারির রূপ নিচ্ছে হাম! দুই হাসপাতালের আইসিইউতে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

সিলেট ব্যুরো
spot_img
spot_img

সিলেট বিভাগে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব। বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিদিন নতুন নতুন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এবার সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ৪৩ জন অবুজ শিশু তীব্র উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই চার শিশুর মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই ৪ জনসহ চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৫১ জন শিশুর অকাল মৃত্যু হলো। বর্তমানে পুরো বিভাগে ২৯৫ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মারা যাওয়া চার শিশুর পরিচয় ও বয়স

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মারা যাওয়া শিশুদের বয়স অত্যন্ত কম এবং তারা সবাই আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিল। মৃত শিশুদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • ১. সিলেটের শাহপরাণ এলাকার বাসিন্দা (বয়স ১ বছর ৩ মাস)।

  • ২. সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কালারুকা গ্রামের বাসিন্দা (বয়স ৬ মাস ২৭ দিন)।

  • ৩. মৌলভীবাজারের দুর্গানগর এলাকার বাসিন্দা (বয়স ৫ মাস ১৭ দিন)।

  • ৪. সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা (বয়স ৬ মাস ১০ দিন)।

সিলেট বিভাগে হাম ও রুবেলা পরিস্থিতির সর্বশেষ পরিসংখ্যান:

হাসপাতালের নাম ও চিকিৎসাধীন রোগী জেলাভিত্তিক ল্যাব নিশ্চিত রোগী (মোট ১৫৮) চলতি বছরে মোট মৃত্যুর বিভাজন (মোট ৫১)
শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল: ৮৯ জন সুনামগঞ্জ জেলা: ৮৪ জন (সর্বোচ্চ) সন্দেহজনক হামের উপসর্গ: ৪৭ জন।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ: ৫৮ জন সিলেট জেলা: ৪২ জন ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হাম: ৪ জন।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল: ৫৫ জন মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ: ৩২ জন (হবিগঞ্জে ২ জন রুবেলা)। সর্বমোট শিশু মৃত্যু (১ জানুয়ারি থেকে): ৫১ জন।
ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত ১৫৮ জন: শীর্ষে সুনামগঞ্জ

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ল্যাব টেস্ট বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৮ জনে। জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জ।

মোট শনাক্ত হওয়া ১৫৮ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ সুনামগঞ্জে ৮৪ জন, সিলেটে ৪২ জন, মৌলভীবাজারে ১৬ জন এবং হবিগঞ্জে ১৬ জন শনাক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য, হবিগঞ্জে শনাক্ত হওয়া ১৬ জনের মধ্যে ২ জনের শরীরে মারাত্মক ‘রুবেলা’ (Rubella) ভাইরাস পজিটিভ এসেছে।

হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড় ও চিকিৎসকদের উদ্বেগ

বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি সাধারণ হাসপাতাল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ (তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ, সর্দি-কাশি) নিয়ে ২৯৫ জন রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে সিলেট বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮৯ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৮ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৫ জন শিশু মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এছাড়া অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেও অনেকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আনার পর মোট ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ল্যাব টেস্টে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া হাম রোগে মারা গেছে ৪ জন। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। আকস্মিক এই শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধিতে সিলেটের সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং শিশুদের ইপিআই (EPI) টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সর্বশেষ নিউজ