কয়েক মাসের তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে বরখাস্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে। একই সঙ্গে আকস্মিক এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটির বর্তমান সরকারকেও পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) রাতে একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মাধ্যমে এই নাটকীয় ঘোষণা দেওয়া হয়। ঋণসংকটে জর্জরিত পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটিতে এই আকস্মিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গভীর কূটনৈতিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
পশ্চিমাদের সমকামিতা নীতি ও সোনকোর কড়া হুঁশিয়ারি
পদ হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন ওসামন সোনকো। সম্প্রতি তিনি প্রকাশ্য এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ‘স্বৈরাচারী’ পশ্চিমা দেশগুলো অন্যান্য স্বাধীন দেশের ওপর সমকামিতাকে ‘চাপিয়ে দেওয়ার’ জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, সেনেগালে সমকামিতাসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর করে সম্প্রতি দেশটির সংসদে একটি নতুন আইন পাস করা হয়েছে। এই আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই সেনেগাল আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ফ্রান্সের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়। পশ্চিমাদের উদ্দেশে সোনকো কড়া জবাব দিয়ে বলেছিলেন, “তারা যদি এই পথ (সমকামিতা) বেছে নিয়ে থাকে, তবে সেটা সম্পূর্ণ তাদের সমস্যা। এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে আমাদের কোনো শিক্ষা বা জ্ঞান নেওয়ার প্রয়োজন নেই, একদমই না।” সোনকোর ওই ঝাঁঝালো মন্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে বরখাস্ত করার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে নানা আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আকস্মিক ঘোষণা
প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ওমর সাম্বা বা সরকারি টেলিভিশনে হাজির হয়ে এই বিশেষ অধ্যাদেশটি পড়ে শোনান। তিনি বলেন, “মহামান্য প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে এক বিশেষ ডিক্রি বলে প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে বর্তমান সরকারে থাকা সকল মন্ত্রীদেরও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অবসান ঘটেছে।” তবে ওসামন সোনকোকে সরিয়ে দেওয়ার পর সেনেগালের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
‘আজ শান্তিতে ঘুমাব’: বরখাস্তের পর সোনকো
প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে নাটকীয়ভাবে বরখাস্ত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে ওসমান সোনকো লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আজ রাতে আমি কুয়ের গরগুইয়ে শান্তিতে ঘুমাব।” উল্লেখ্য, ডাকারে অবস্থিত ‘কুয়ের গরগুই’ মূলত সোনকোর নিজস্ব এলাকা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, মধ্যরাতের পর সোনকো যখন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছেড়ে নিজ বাড়িতে পৌঁছান, তখন সেখানে তাঁর শত শত আবেগপ্রবণ সমর্থক জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
রাজনৈতিক গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক তিক্ততার রূপরেখা
সেনেগালের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে মূলত ওসমান সোনকোর রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর ভর করেই ২০২৪ সালে দেশটিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। গত নির্বাচনে সোনকোরই প্রেসিডেন্ট হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ও জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু একটি রাজনৈতিক মানহানির মামলায় আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি।
সে সময় সোনকো তাঁর রাজনৈতিক শিষ্য ফায়েকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে ভোটারদের বলেছিলেন, “আমার চেয়েও ফায়ে বেশি নীতিবান। তাঁকে ভোট দেওয়ার অর্থ, আমাকেই ভোট দেওয়া।” ওসামন সোনকো ও বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে যৌথভাবে সেনেগালে ‘পাস্তেফ পার্টি’ (PASTEF) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দুর্নীতি দমন এবং দুর্বল অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণদের প্যান-আফ্রিকান ও ফ্রান্সবিরোধী সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে তারা প্রথম দফার ভোটেই বিশাল জয় অর্জন করেন।
জনপ্রিয়তার দিক থেকে সোনকো অনেক এগিয়ে থাকলেও, সাংবিধানিকভাবে সেনেগালের সব একক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে। গত মে মাসের শুরুতে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ফায়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁর আস্থা থাকা পর্যন্তই ওসমান সোনকো প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন। অন্যদিকে, সমালোচকদের রাজনৈতিক আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছিলেন সোনকো। শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটল এই বরখাস্তের মাধ্যমে।

