দেশব্যাপী চলমান প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের ‘স্কুল ফিডিং’ কার্যক্রমে কোমলমতি শিশুদের জন্য নির্ধারিত পুষ্টিকর খাদ্যের মান এবং সময়মতো তা সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা, দুর্নীতি কিংবা অনিয়ম কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সাথে সরাসরি জড়িত এই মেগা প্রকল্পে যারা গাফিলতি করবেন, তারা সরকারি কর্মকর্তা হোন কিংবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
আজ রোববার (২৪ মে ২০২৬) রাজধানীতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির লাইসেন্সধারী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে আয়োজিত এক জরুরি নির্দেশনামূলক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এটি কোনো সাধারণ সভা নয়, সাড়ে ৫ হাজার কোটির মেগা প্রকল্প
মতবিনিময় সভার গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, “এটি মন্ত্রণালয়ের কোনো রুটিন বা সাধারণ সভা নয়। এটি সরাসরি দেশের কোটি শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জাতীয় কর্মসূচি। তাই এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করতে হবে।”
তিনি তথ্যের খতিয়ান তুলে ধরে জানান, বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় অত্যন্ত সফলতার সাথে এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার পেছনে সরকারের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রজেক্ট পরিচালিত হচ্ছে। এত বড় একটি জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিতে যদি মাঠপর্যায়ে জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ না হয় বা কোনো অনিয়ম সামনে আসে, তবে তা বর্তমান সরকার তথা সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
খাদ্যের মান নিশ্চিত করতে কঠোর ৫ নির্দেশনা
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশ্যই ব্যবসাবান্ধব এবং আমরা উদ্যোক্তাদের সব ধরণের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু ব্যবসার মুনাফার দোহাই দিয়ে আমাদের কোমলমতি শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্যের গুণগত মানের সাথে বিন্দুমাত্র আপস করার কোনো সুযোগ নেই। যারা সঠিকভাবে শর্ত মেনে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দিতে পারবেন না, তারা ভবিষ্যতে এই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে থাকার যোগ্যতা হারাবেন।
খাদ্যের গুণগত মান ধরে রাখতে প্রতিমন্ত্রী সভায় বেশ কিছু নতুন ও কঠোর সাংগঠনিক নির্দেশনা অনুসরণের নির্দেশ দেন:
-
সাপ্লাই চেইন ম্যাপিং: খাদ্য কোথা থেকে আসছে, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে এবং কার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে পৌঁছাচ্ছে—তার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্র্যাকিং সরকারের কাছে থাকতে হবে।
-
ফুড টেকনিশিয়ান নিয়োগ: প্রতিটি সরবরাহকারী কেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে ফুড টেকনিশিয়ান রাখতে হবে।
-
স্থানীয় উৎস: খাদ্য সামগ্রী স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে হবে।
-
সময়মতো ডেলিভারি: প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি বিদ্যালয়ে তাজা ও মানসম্মত খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে।
-
মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার: নিয়মিত বিরতিতে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে খাবারের গুণগত মান অডিট করা হবে।
মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বিভিন্ন সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে খাদ্য পরিবহন ও সংরক্ষণের বিভিন্ন বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার কথা মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য শোনার পর প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও নিশ্ছিদ্র করতে মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা আরও জোরদার করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন—প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শাহীনা ফেরদৌসী, প্রকল্পের মূল পরিচালক, উপপরিচালকবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট সকল ঠিকাদার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) এবং বিভিন্ন উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাবৃন্দ।

