মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে ৩ বাংলাদেশি নিহত, লাশ উদ্ধার করতে গিয়ে আরও ২ জনের মৃত্যু 

ন্যাশনাল ডেস্ক
spot_img
spot_img

বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তের বান্দরবান অংশে ফের এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা ঘটেছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের শূন্যরেখা (জিরো পয়েন্ট) সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় নিষিদ্ধ স্থলমাইন (Landmine) বিস্ফোরণে ৩ জন আদিবাসী বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সীমান্ত এলাকায় কাজ করতে গিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন তাঁরা।

আজ রোববার (২৪ মে ২০২৬) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘুমধুমের দুর্গম ভালুকিয়াপাড়া সীমান্ত এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান।

লাশ উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুই জুমচাষী নিহত!

সীমান্তের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য বাবুল চাকমা ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে জানান, নিহত ৩ জনই স্থানীয় ভালুকিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় জুমচাষী। রোববার সকালে তাঁরা মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলের একটি কলাবাগানে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন।

দুপুরের দিকে কাজ শেষে জঙ্গল দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় জিরো পয়েন্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা একটি শক্তিশালী স্থলমাইনের ওপর অসাবধানতাবশত পা লেগে যায় একজনের। তাৎক্ষণিকভাবে বিকট শব্দে মাইনটি বিস্ফোরিত হলে স্পটেই তাঁর মৃত্যু হয়। ইউপি সদস্য আরও জানান, প্রথম বিস্ফোরণের পর ছিটকে পড়া সঙ্গীকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করতে যখন বাকি দুইজন পাহাড়ি খাদের দিকে এগিয়ে যান, ঠিক তখনই সেখানে থাকা আরও একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এতে উদ্ধার করতে যাওয়া বাকি দুইজনও ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

দুর্গম পাহাড় পাড়ি দিয়ে লাশ উদ্ধার: গ্রাম জুড়ে কান্না

সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ে ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণ ও ৩ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে দুপুর আড়াইটার দিকে স্থানীয় গ্রামবাসীদের একটি সাহসী দল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখানে তারা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় অংক্যমং তংচঙ্গ্যা, চোপোচিং চাকমা এবং চিংক্ষং চাকমার লাশ পড়ে থাকতে দেখে বিজিবি ও পুলিশকে খবর দেয়।

নিহতদের মরদেহগুলো পাহাড়ি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর ভালুকিয়াপাড়া ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সীমান্তের বাতাস।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করায় দুর্ঘটনা: ইউএনও ও ওসির বক্তব্য

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান বলেন, “মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ জনগণকে সীমান্তে চলাচলে কঠোর বিধি-নিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রশাসনের এই কড়া বাধা ও রেড অ্যালার্ট উপেক্ষা করে জুমচাষের নামে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে চলে যাওয়ার কারণেই আজ এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

এই বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানান, “ঘুমধুম সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত হওয়ার পর পুলিশ ও বিজিবির যৌথ সহায়তায় মরদেহগুলো জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। এই বিষয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রয়োজনীয় আইনি ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সীমান্তে বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের চলাচলে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

সর্বশেষ নিউজ