বাংলাদেশে উন্নয়ন বাজেটের ৫০ পার্সেন্ট‌ই দুর্নীতিতে চলে যায়: মাওলানা ইউসুফ আশরাফের ক্ষোভ

ডেস্ক রিপোর্ট
spot_img
spot_img

আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-কে সামনে রেখে দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোচন ও জনকল্যাণমুখী সুশাসন নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ও সুপারিশমালা পেশ করেছে অন্যতম প্রধান ধর্মীয়-রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। বাজেট বাস্তবায়নে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতিকে প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ বলেছেন, “বাংলাদেশে উন্নয়ন বাজেটের ৫০ পার্সেন্ট‌ই দুর্নীতিতে চলে যায়। বাকি ৫০ পার্সেন্টের প্রকৃত কাজ মাঠপর্যায়ে আদৌ হয় কি না—তা নিয়েও জনগণের মনে তীব্র সন্দেহ আছে। দেশ থেকে বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। আমরা যদি একটি দুর্নীতিমুক্ত ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক বণ্টন নিশ্চিত করতে পারি, তবেই কেবল জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন সম্ভব।”

আজ রবিবার (২৪ মে ২০২৬) বিকেল ৩টায় ঢাকার পুরানা পল্টনস্থ ৫৯/৩/৩ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে এই বিশেষ প্রস্তাবনা ও সুপারিশমালা উপস্থাপনের লক্ষ্যে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ও অর্থনীতির ৫ চ্যালেঞ্জ

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদ সংগঠনের পক্ষে সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাবনা পাঠ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ও রেকর্ড আকৃতির হলেও, দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যদি কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকে—তবে শুধু কাগজের বাজেটের আকার বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে কোনো সুফল বয়ে আনবে না।”

লিখিত প্রস্তাবনায় বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ৫টি সংকট ও চ্যালেঞ্জকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়:

১. অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি

২. যুবসমাজের ব্যাপক বেকারত্ব

৩. আশঙ্কাজনক রাজস্ব ঘাটতি

৪. বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা

৫. বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান ও বিপজ্জনক চাপ

খেলাফত মজলিসের বাজেট প্রস্তাবনা ও সুপারিশমালার একনজরে খতিয়ান:

খাতের নাম প্রস্তাবিত বাজেট ও শুল্ক কাঠামো মূল দাবি ও সুপারিশসমূহ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
শিক্ষা খাত জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন; AI যুক্ত করা। শাপলা চত্বর ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন।
স্বাস্থ্য খাত জিডিপির অন্তত ২.৫ শতাংশ বরাদ্দ। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ও জেনেরিক ওষুধ বাধ্যতামূলক করা। জাতীয় শহীদ কল্যাণ বোর্ড গঠন ও আহত-নিহত পরিবারকে মাসিক ভাতা।
বাণিজ্য ও কৃষি চাল, ডাল, তেল, চিনি, শিশুখাদ্যে ভ্যাট হ্রাস। ওএমএস কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ; মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। ইসলামী অর্থায়নে সুকুক বন্ড ও যাকাতদাতাদের করছাড়ের সুবিধা।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও AI ভিত্তিক কর্মসংস্থানের ছক

সংগঠনের পক্ষ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম ও শিশুখাদ্যের উপর থেকে সমস্ত আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট আমূল হ্রাসের জোর দাবি জানানো হয়। একই সাথে ওএমএস (OMS) কার্যক্রমকে জেলা শহর ছাড়িয়ে অবিলম্বে উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ এবং সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। কৃষিখাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রুখতে কৃষকদের সরাসরি নগদ ভর্তুকি ও ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ‘ডিজিটালাইজেশন’ করার প্রস্তাব করা হয়।

বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়ে খেলাফত মজলিস তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কর অবকাশ (Tax Holiday), সুদমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, আইটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং প্রতিটি বিভাগে “ডিজিটাল স্কিলস হাব” প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং দেশের প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে সুদমুক্ত ফাইন্যান্সিং চালুর প্রস্তাব করা হয়।

ইসলামী অর্থায়ন ও শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সুদমুক্ত করতে সুদভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ ইসলামী অর্থায়ন কাঠামো প্রবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। এ লক্ষ্যে সুকুক বন্ড চালু, সুদমুক্ত স্পেশাল SME তহবিল গঠন, ওয়াকফভিত্তিক সামাজিক উন্নয়ন খাত তৈরি এবং নিয়মিত যাকাতদাতাদের করছাড়ের (Tax Rebate) মতো যুগান্তকারী প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।

বিকল্প বাজেটের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও মানবিক দাবি জানিয়ে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের শহীদ পরিবার এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণকারী ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, স্থায়ী পুনর্বাসন, আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা এবং পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত মাসিক ভাতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে সকল শহীদ পরিবারের রাষ্ট্রীয় দেখভালের জন্য একটি স্থায়ী “জাতীয় শহীদ কল্যাণ বোর্ড” গঠনের দাবি জানায় দলটি।

প্রেস ব্রিফিংয়ে সমাপনী বক্তব্যে নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ আরও বলেন, “বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব কিছু নয়। আর এই লুণ্ঠিত টাকা যদি দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে সাধারণ জনগণকে প্রণোদনা ও কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া কোনো ব্যাপারই না।”

উক্ত বাজেট ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন—নায়েবে আমীর মাওলানা কুরবান আলী কাসেমী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল, মাওলানা এনামুল হক মুসা, মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী, বায়তুলমাল সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহমান, অফিস সম্পাদক মাওলানা রুহুল আমীন, প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা হারুনুর রশিদ ভূইয়া, আইন সম্পাদক মাওলানা শরীফ হুসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা সানাউল্লাহ আমিনী, ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুরশিদ আলম সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশ যুব মজলিসের সভাপতি পরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুল্লাহ আশরাফ সহ সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

সর্বশেষ নিউজ