বিএসইসিতে নেতৃত্ব বদল: নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img
দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। দেশের খ্যাতনামা করপোরেট ব্যক্তিত্ব ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খানকে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সংস্থটিতে তিন নতুন কমিশনারকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের খবরে বিনিয়োগকারীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং দেশের পুঁজিবাজারে এর অত্যন্ত ইতিবাচক ও জোরালো প্রভাব দেখা গেছে।

গতকাল ৪ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে চার বছরের জন্য এই নিয়োগ দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে সকালেই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিএসইসির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ পাঁচ সদস্যের পুরো কমিশন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

নতুন কমিশন গঠন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিএসইসি আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। নতুন নিয়োগ পাওয়া তিন কমিশনার হলেন—ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিজ আল তারিক, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাহিদ মাহতাব এবং আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান। কমিশনের অপর একটি কমিশনার পদ আপাতত শূন্য রাখা হয়েছে।

সুশাসন, ফিন্যান্স এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ৭১ বছর বয়সী মাসুদ খানকে বিএসইসিতে যুক্ত করতে সম্প্রতি আইনি সংস্কার এনেছে সরকার। পূর্বে আইন অনুযায়ী বিএসইসির চেয়ারম্যান পদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৫ বছর থাকলেও গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে এই বয়সসীমা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। যার ফলে এই প্রবীণ করপোরেট লিডারের বিএসইসি প্রধান হওয়ার পথ সুগম হয়। মাসুদ খান বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও সূচকের বড় উত্থান

বিএসইসির নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই খবরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বের বিদায় ও নতুন দক্ষ পেশাদারদের আগমনের খবরে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে দীর্ঘদিন পর এক ধরনের প্রবল উৎসাহ ও আস্থা তৈরি হয়।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার লেনদেন শুরুর পর থেকেই বাজারে শেয়ার ক্রয়ের চাপ বাড়তে থাকে। দুপুরের দিকে যখন নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়, তখন সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও বেগবান হয়। বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তায় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এবং সিএসইর সার্বিক সূচক বড় ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়ে দিনশেষে বাজার ইতিবাচক অবস্থানে বন্ধ হয়। বাজারের এই উত্থানকে বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পুনর্গঠনের প্রতি সরাসরি ‘আস্থার প্রতিফলন’ হিসেবে দেখছেন।

বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি ও প্রত্যাশা

নর্থওয়েস্ট সিকিউরিটিজের পরিচালক বিজন চক্রবর্তী এইদিন এইসময়কে নতুন কমিশন প্রসঙ্গে বললেন, বাজারের টানা মন্দা ও নীতিনির্ধারণী কিছু সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের আস্থার সংকটে ভুগছিলেন। মাসুদ খানের মতো একজন অভিজ্ঞ, সৎ এবং করপোরেট খাতের সফল মানুষকে পুঁজিবাজারের অভিভাবক হিসেবে পেয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে।

বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর প্রতিনিধিদের মতে, নতুন চেয়ারম্যানের দীর্ঘ চার দশকের করপোরেট ও আর্থিক খাতের অভিজ্ঞতা পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নতুন কমিশন দ্রুত পুঁজিবাজারের তারল্য সংকট সমাধান, ভালো ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সর্বশেষ নিউজ