ইসলামী ব্যাংকে নজিরবিহীন অচলাবস্থা: ঋণখেলাপি চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের যুগপৎ আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img
দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে (আইবিবিএল) নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার দাবিতে একদিকে সাধারণ গ্রাহকরা টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করছেন, অন্যদিকে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের এই যুগপৎ আন্দোলনে দেশজুড়ে ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন ও সেবাদান কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন চেয়ারম্যান: চলমান এই অস্থিরতার মূল কারণ ব্যাংকটির নতুন পরিচালনা পর্ষদ এবং এর চেয়ারম্যান মো. খুরশিদ আলম। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বর্তমান পর্ষদের অদক্ষতায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে স্বয়ং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশিদ আলম নিজে একজন ঋণখেলাপি এবং তার স্ত্রীও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের (এফএসআইবিএল) চিহ্নিত ঋণখেলাপি। এমন বিতর্কিত এবং ঋণখেলাপি ব্যক্তির হাতে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত নিরাপদ নয় বলে মনে করছেন গ্রাহক ও কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তাদের ‘কলম বিরতি’ ও ৭ দফা দাবি: গ্রাহক অসন্তোষের মাঝেই বৃহস্পতিবার (৪ জুন) নতুন মাত্রা যোগ করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আন্দোলন। ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে এদিন দেশজুড়ে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন শাখায় এক ঘণ্টার প্রতীকী কর্মবিরতি বা ‘কলম বিরতি’ পালন করেন কর্মকর্তারা।

দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে কর্মকর্তারা নিজ নিজ ডেস্কে উপস্থিত থাকলেও সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ ও লেনদেন থেকে বিরত থাকেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বর্তমান চেয়ারম্যান মো. খুরশিদ আলমের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ এবং আগের পরিচালনা পর্ষদকে পুনর্বহাল করা। সব মিলিয়ে মোট ৭ দফা দাবিতে তারা এই কর্মসূচি পালন করছেন।

দেশজুড়ে চরম ভোগান্তি: টানা চার দিনের গ্রাহক বিক্ষোভ এবং বৃহস্পতিবার কর্মকর্তাদের কলম বিরতির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকরা। বিভিন্ন শাখায় এক ঘণ্টার কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচির কারণে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি অনেকে। জরুরি প্রয়োজনে নগদ অর্থ উত্তোলন, রেমিট্যান্স সংগ্রহ বা ব্যবসায়িক লেনদেন করতে এসে গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের কড়া হুঁশিয়ারি: ব্যাংকে চলমান এই অস্থিরতা ও সেবাদান বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসেন এক বার্তায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ব্যাংক চলাকালীন কোনো ধরনের কর্মবিরতির অনুমোদন ম্যানেজমেন্ট দেয়নি।

তিনি বলেন, “সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা যদি কর্মবিরতির নামে গ্রাহক সেবা বন্ধ রাখেন বা ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রাহকদের একটি অংশ এবং কিছু কর্মকর্তা সেবা প্রদান থেকে বিরত থাকায় এই সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে তারা কাজ করছেন।

সর্বশেষ নিউজ