দৌলতদিয়ায় নদীতে পড়া বাস আড়াই ঘণ্টা পর উদ্ধার; পুলিশের তৎপরতায় বাঁচল ৪০ প্রাণ

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী বাসটি প্রায় আড়াই ঘণ্টার দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ নদী থেকে বাসটিকে টেনে ফেরির ওপর তুলতে সক্ষম হয়। তবে এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, ফেরিতে ওঠার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে নৌ পুলিশের কঠোর তৎপরতায় বাসের সমস্ত যাত্রীকে জোরপূর্বক নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বিগত ঈদের মতো বড় ধরণের কোনো রক্তাক্ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

আজ শুক্রবার (৫ জুন ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ বাসটিকে টেনে ঘাটে থাকা কে-টাইপ ফেরি করবীর ওপর তোলে। এর আগে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের বাসটি এই দুর্ঘটনার শিকার হয়।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে র‍্যাম ভেঙে পদ্মায়: আহত চালক ও সহকারী হাসপাতালে

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে আসা বাসটি ঘাটে পৌঁছালে হ্যান্ডমাইকে যাত্রীদের নিচে নেমে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরবর্তীতে নৌ পুলিশ এসে যাত্রীদের নামাতে সহযোগিতা করে। যাত্রীরা নামার পরপরই মুহূর্তের মধ্যে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে করবী ফেরির র‍্যাম ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। নদী থেকে বাসের চালক ও তাঁর সহকারীকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন বাসের চালক ঝন্টু আলী (৪৮) জানান, সকাল সোয়া সাতটার দিকে কুষ্টিয়ার মদনপুর থেকে ৩৭ জন যাত্রী এবং চালক-সহকারীসহ প্রায় ৪০ জন নিয়ে তাঁরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে ফেরি ভেড়ানোর পর নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীদের নামতে বলা হলেও অনেকে নামতে চাচ্ছিলেন না। পরে নৌ পুলিশ জোরাজুরি করে তাদের নামিয়ে দেয়। গাড়িটি চালু করতেই হঠাৎ ব্রেক ফেল করে সরাসরি করবী ফেরির র‍্যামে আঘাত করে নদীতে পড়ে যায়। তিনি ও সহকারী জানালার কাচ ভেঙে অলৌকিকভাবে বের হয়ে আসেন।

“আল্লাহ আমাদের বাঁচাতে পুলিশ পাঠিয়েছিলেন”—বিজিবি কলেজের শিক্ষক

বাসে থাকা মালামাল ও ব্যাগপত্র নদী থেকে তোলার পর উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে যাত্রীদের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। বাসে থাকা যাত্রী এবং বিজিবির সদর দপ্তরের নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আবדוস সালাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি মাঝেমধ্যেই এই পরিবহনে ঢাকা যাতায়াত করি, কিন্তু অলসতার কারণে কখনো ফেরিঘাটে বাস থেকে নামতাম না। আজকেও আমি নামতে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে নৌ পুলিশ এসে আমাদের জোর করে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। আমরা নামার ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি চোখের সামনে নদীগর্ভে তলিয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশ পাঠিয়েছিলেন।”

can we do it? উল্লেখ্য, দৌলতদিয়া ঘাটে বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে গত ২৫ মার্চ কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে উঠতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়, যেখানে ২৬ জন সাধারণ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছিলেন।

৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন: জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, “আজকের এই বড় দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। মূলত প্রশাসনের হ্যান্ডমাইকিং এবং নৌ পুলিশের সময়োপযোগী সচেতনতার কারণেই আজ ৪০টি তাজা প্রাণ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।”

তিনি আরও জানান, এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ থেকে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ফেরিঘাটের নিরাপত্তা ও ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাসের ছাদ ও বডি থেকে উদ্ধারকৃত যাত্রীদের সমস্ত মালামাল জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে দ্রুত প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তরের কাজ চলছে।

সর্বশেষ নিউজ