রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ‘বেআইনি’ বলে দাবি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে এই দাবি তুলে ধরে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সাথে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে নিহত শিশুদের পরিবার স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান, কিন্তু কোনোভাবেই হাসপাতাল বন্ধের ঘোষণা চান না।
আজ শনিবার (৬ জুন ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর উপস্থিতিতে যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে মানবিক কারণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের ভূমিকা ও আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির。
কারণ দর্শানোর নোটিশে আইনি অস্পষ্টতা ও বিইআরসির মতো হুংকার
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গত বৃহস্পতিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটার জবাব আগামীকাল রবিবার বিকেল ৫টার মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রদান করা হবে। কিন্তু নোটিশে জবাবের বিষয় সন্তোষজনক না হলে কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে—যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনসম্মত নয়।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সারমর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “তদন্ত রিপোর্টে শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে ওয়ার্ডে অক্সিজেন স্বল্পতা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক কতটুকু ছিল এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড কী পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল, সেটার কোনো সুনির্দিষ্ট গাণিতিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ঠিক কতটুকু অক্সিজেন থাকলে নবজাতকের মৃত্যু ঘটবে না, সে বিষয়েও রিপোর্টে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যা পুরো তদন্তকে অস্পষ্ট করে তোলে।”
পেশাগত অবহেলায় ২ স্টাফ বরখাস্ত, আজীবন ফ্রি চিকিৎসার ঘোষণা
গত ২৭ মে হাসপাতালে ঘটে যাওয়া এই দুঃখজনক ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা’ হিসেবে স্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ。 পাঁচ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে পেশাগত দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার অভিযোগে দুইজন নার্স ও নিম্নপদস্থ স্টাফকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।
নিহত শিশুদের পরিবারগুলোর পাশে আজীবন থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সম্মানজনক আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে。 এর পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের যোগ্য সদস্যদের হাসপাতালে চাকরির সুযোগ এবং তাদের পরিবারের জন্য আজীবন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার অফিশিয়াল ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন চলাকালে অতীতে সাংবাদিকদের ওপর ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন হাসপাতালের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুর সবুর খান।
“আল্লাহর ওয়াস্তে হাসপাতাল বন্ধ করবেন না”—ভুক্তভোগী পিতা হাবিবুর
সংবাদ সম্মেলনে নিহত নবজাতকদের অন্যতম পিতা হাবিবুর রহমান (যিনি এই ঘটনায় প্রথমে থানায় মামলা করেছিলেন) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বাসে থাকা যাত্রীদের অলৌকিক রক্ষার মতো আদ্-দ্বীনের সেবার অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটি ছিল আমার তৃতীয় সন্তান। আমার আগের প্রথম দুই সন্তানও এই একই হাসপাতালে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সুস্থভাবে জন্ম নিয়েছিল। এখানকার সেবায় সন্তুষ্ট দেখেই এবারও আমরা এসেছিলাম।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো প্রকার জোরজুলুম বা আর্থিক প্রলোভনে পড়ে তারা অবস্থান পরিবর্তন করেছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, “আমরা চাই যে প্রকৃত দোষী, তদন্ত সাপেক্ষে কেবল তারই দৃষ্টান্তমূলক সাজা হোক। কিন্তু আদ্-দ্বীনের মতো একটি মানবিক হাসপাতাল বন্ধ ঘোষণা হোক, তা আমরা কোনোভাবেই চাই না। আমরা চাই হাসপাতালের বিদ্যমান কারিগরি ত্রুটিগুলো দ্রুত সংশোধন করা হোক এবং সাধারণ মানুষের জন্য এর চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চিরকাল চালু থাকুক।”

