জেলনস্কির খোলা চিঠি। শ্বেত ভল্লুক থামবে কি?

উপ সম্পাদকীয়
spot_img
spot_img

গত শতাব্দীর শেষ দিকে যখন সোভিয়েত  ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়, তখন আজকের রুশ  প্রজাতন্ত্রের কোন অভিভাবক ছিল  বলে আমার অন্তত  মনে হয় না। আমার মতে, থাকলে আজকের ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ নাও হতে পারতো।

একথা এজন্য বলা যে গত কয়েক শতাব্দী  যাবত এশিয়া ইউরোপ জুড়ে জার রাজবংশের অধীনে যে সাম্রাজ্য বিদ্যমান ছিল তার বিলোপ  সাধন সহজ হলে রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত  ইউনিয়ন গড়ে উঠত না।  জার শাসনের অবসানের পর কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে,  বলা ভালো রুশ জাতির নেতৃত্বে যে নতুন শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তা ছিল আরো বেশি শক্তিশালী এবং পরিধি ও প্রভাবের দিক দিয়ে বিশ্বজয়ী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই সোভিয়েত রাশিয়া  বিশ্বব্যাপী যেভাবে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পুরোধা হয়ে ওঠে তাতে এক সময় মনে হয়েছিল পুরো বিশ্বই বুঝি এই ব্যবস্থার অধীনে চলে যাবে।

যদিও পৃথিবীর দেশে দেশে যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত পৃথিবী  দুটি বলয়ে  ভাগ হয়ে যায়। যার একটি মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বিশ্ব, আরেকটি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কম্যুনিস্ট শাসিত সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। পরস্পর বিরোধী এই দুটো বিশ্বই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব  শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু   গত শতাব্দীর শেষ দিকে  কমিউনিস্ট তত্ত্ব  যখন রূপান্তরিত হয়ে যায়  তখনই ঘটে বিপর্যয়। দুই বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় এক বিশ্ব ব্যবস্থা।

একক শক্তি হিসেবে মার্কিন নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিশ্ব ভেঙ্গে পড়া সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে ক্ষেত্র বিশেষে  সহযোগিতা  করে নিজ শক্তির বলয়ভুক্ত করতে।  পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুজিঁবাদী বলয় রুশ জাতির সাথে পরাজিত শক্তির মত আচরণ করতে শুরু করে। লেলিনের সময়  প্রশাসনিক সুবিধার জন্য রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড ভেঙ্গে যে ইউক্রেনের জন্ম দেয়া হয়,তাকে পুনরায় রাশিয়া ভুক্ত না  করে   তার স্বাধীন রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে  মানতে বাধ্য করা হয় তখনকার রুশ নেতৃত্বকে। বর্তমান ইউক্রেন, যে কেন্দ্র থেকে রুশ জাতির  যাত্রা শুরু সেই ইউক্রেনকে দাঁড় করানো হয় রুশ  জাতির প্রতিপক্ষ হিসেবে। একের পর এক বিপর্যয়ে তখনকার রুশ নেতৃত্ব যেন দিশেহারা  হয়ে পড়ে।  এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা নতুন স্বাধীন দেশগুলোও পাশ্চাত্যের  সহযোগিতায় রাশিয়ার সাথে বৈরী আচরণ শুরু করে।

দীর্ঘদিন ধরে কম্যুনিস্ট আন্তর্জাতিকতার আদর্শ চর্চার ফলে রাশান  জাতির মধ্যে জাতীয়তাবাদী  চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং  নেতৃত্বের অযোগ্যতায় আগামী পৃথিবীতে রাশিয়ার অবস্থান কি দাঁড়াবে ঠিক করতে পারেনা মস্কো।

সমুদ্রপথে  রাশিয়াকে অনন্তকালের মত অবরুদ্ধ করার জন্য অপরপক্ষ একের পর এক বৈরী পদক্ষেপ নিতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট দেশগুলো যে সামরিক জোট ওয়ারস গড়েছিল, তা ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিয়ে পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য জোট ন্যাটোকে  নিয়ে  আসে রাশিয়ার দোরগোড়ায়।

এই অবস্থায় রাশিয়ায় আগমন ঘটে সাবেক কেজিবি কর্তা ভলাদিমির  পুতিনের।  রুশ জাতির জন্য একজন পুতিন আসা ছিল অনেকটাই অনিবার্য। পুতিন  রাশিয়ার জনগণের মধ্যে  জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান ঘটিয়ে একের পর এক রুশ বিরোধী ষড়যন্ত্র  দমন করেন। আন্তর্জাতিকতাবাদী  সোভিয়েত ধারা বাদ দিয়ে একজন সাবেক  জার সম্রাটকে  অঘোষিত আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন পুতিন । এটা যেমন ছিল  রুশ জাতীয়তাবাদ, পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতির আলোকে এক ধরনের নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা।

এর বিপরীতে পশ্চিমা বিশ্ব  ইউক্রেনে  আমদানি করে তথাকথিত মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজের নামে  পাশ্চাত্য বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতিনিধি জেলেনাসকিকে।

জেলেনাসকি তার ইউক্রেনীয় রুশ জাতীয়সত্তা বাদ দিয়ে  নিজেদের ইউরোপীয় জাতিসত্তার অংশ ঘোষণা করেন। ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোভুক্ত করে রাশিয়ার সীমান্তে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত সামরিক শক্তি গড়ে তোলার জন্য একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে থাকে।

বাধ্য হয়ে কৃষ্ণ সাগরে ঢোকার জন্য এক সময়ে রাশিয়ার নিজস্ব দ্বীপ  ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ  ক্রিমিয়া  প্রায় বিনা যুদ্ধে দখলে দেয় মস্কো।

ক্রিমিয়া  দখলের ইসুকে কাজে লাগিয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলে  জোরেশোরে ইউরোপীয় হওয়ার জন্য জেলেনসকি ন্যাটোতে যোগ দিতে  উঠে পড়ে লাগে। নিজের সামরিক শক্তি বাড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাশ্চাত্যের সামগ্রিক সহযোগিতা গ্রহণ করতে থাকে। এতে এক সর্বাঙ্গীন যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি  হয় ইউক্রেন রাশিয়ার মধ্যে।

তাই বলা যায়, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ বা রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ ছিল অনিবার্য। যেমন অনিবার্য ছিল নব্য জার হিসেবে পুতিনের  উত্থান।

পুতিনের নেতৃত্বে শ্বেত ভল্লুকের ঘুম যখন ভেঙেই গেছে তখন সে কতদূর যাবে তা শুধু সেই জানে।

তাই যুদ্ধ শুরুর চার বছর পর তা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে  পুতিনকে লেখা জেলেনেস্কির খোলা চিঠি কোন ভূমিকা রাখবে কিনা বলা যাচ্ছে না। জেলেনেস্কির ভাষায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম ব্যস্ত, তাই রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে তিনি কোন ভুমিকা রাখতে পারবেন না।

ইরান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতই ব্যস্ত থাক না কেন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে এই  বিশ্ব মোড়লকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই, যেমন নেই  ইরান=ইসরাইল মার্কিন  যুদ্ধে রাশিয়ার নব্য জার পুতিনকে বাদ রাখার সুযোগ। খোলা চিঠিতে জেলেনেসকি দাবী করেছেন যুদ্ধ শুরুর পর যেসমস্ত ইউক্রেনীয় শিশুদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদেরকে ফেরৎ দিতে হবে। যতদুর জানা যায় ইতোমধ্যে ইউক্রেনের যে অংশ রুশ দখলে এসেছে সেখানে রুশ ভাষা ও সংস্কৃতি প্রভাব রয়েছে, যা জেলেনেস্কি পাল্টানোর জন্য শিশুদের ইউরোপীয় হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলেন। মূলত রুশ প্রভাব মুক্ত ইউক্রেন গড়ার জন্য জেলেনেস্কির এ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচী। এই শিশুদের ইউক্রেন থেকে রাশিয়া এনে তাদেরকে পুনরায় রুশ ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষা দান করা হচ্ছে। এ অবস্থায় অস্ত্রের যুদ্ধ শেষ হলেও ভাষা ও সাংস্কৃতির যুদ্ধ শেষ হবেনা। পাশাপাশি আবারো বিশ্ব পরাশক্তি হতে হলে ইউক্রেন যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া ছাড়া পুতিনের আর কোন বিকল্প নেই।

সর্বশেষ নিউজ