নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের বিশেষ চেকপোস্টে তল্লাশি চালিয়ে ৩টি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিনসহ আবদুর রহমান ওরফে রাহিম (২১) নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে। তবে এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার চেয়েও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে আটককৃত যুবকের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি। অনুসন্ধানে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যে নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলটিসহ অপরাধী ধরা পড়েছে, সেটি স্থানীয় এক বিএনপি নেতার; অথচ খোদ বিএনপি নেতারাই দাবি করছেন আটক যুবক নাকি জামায়াতের কর্মী! এই নিয়ে নোয়াখালীর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র কাদা-ছোড়াছুড়ি ও চাঞ্চল্য।
সোমবার (৮ জুন ২০২৬) বিকেলে উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর-বাংলাবাজার সড়কের বায়তুন নূর জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় এই রুদ্ধশ্বাস অভিযান পরিচালনা করে বেগমগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ।
কোমরে গোঁজা ৩ পিস্তল ও গুলি: যেভাবে ধরা পড়ল রাহিম
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আটক আবদুর রহমান ওরফে রাহিম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বসন্তবাগ গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির জসিম উদ্দিনের ছেলে। জেলাজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধীদের দমনে পুলিশ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে গোপালপুর-বাংলাবাজার সড়কে অবস্থান নেয় পুলিশ। সন্ধ্যা সোয়া sechsটার দিকে একটি নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুতগতিতে পার হওয়ার সময় রাহিমকে থামার সংকেত দেওয়া হয়। তাকে থামানোর পর তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হলে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তার দেহে তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে যুবকের কোমরে গোঁজা অবস্থায় ৩টি আধুনিক বিদেশি পিস্তল, ৮টি তাজা গুলি এবং ৩টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। এ সময় অস্ত্র premature বহনে ব্যবহৃত রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেলটিও জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
টুইস্ট যেখানে: বিএনপি নেতার বাইক বনাম জামায়াত কর্মী দাবির রহস্য
অস্ত্রসহ রাহিম নামের এই যুবক ধরা পড়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় রাজনৈতিক নাটকীয়তা। বেগমগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামাক্ষ্যা চন্দ্র দাশ নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে আটক আবদুর রহমান রাহিমকে ‘স্থানীয় জামায়াতের কর্মী’ বলে একটি পোস্ট দেন এবং দাবি করেন সে জামায়াতের হয়েই কাজ করে।
তবে এই দাবির বিপরীতে আসল টুইস্টটি বের হয়ে আসে যখন জামায়াত নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বাসিন্দারা মোটরসাইকেলটির মালিকানা নিয়ে তথ্য দেন। বিষয়টি নিয়ে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. বোরহান উদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিএনপির দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। জামায়াত নেতার দাবি, “পুলিশের হাতে অস্ত্রসহ আটক ব্যক্তির সঙ্গে জামায়াতের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের সময় অনেকেই প্রার্থীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, তার মানে এই নয় যে তিনি দলীয় কর্মী হয়ে গেছেন।”
তিনি আরও বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে বলেন, “আমরা যতটুকু নিশ্চিত হয়েছি, নির্বাচনের পর থেকেই রাহিম স্থানীয় ছাত্রদলের প্রভাবশালী কর্মী সম্রাটের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। এমনকি পুলিশ যে মোটরসাইকেলটি জব্দ করেছে, সেটিও মূলত ছাত্রদল ও বিএনপি নেতা সম্রাটের।” ফলে অপরাধী যে গাড়ি ব্যবহার করে বিএনপির হয়ে কাজ করছিল, সেটি নিজেদের দলের নেতার হওয়া সত্ত্বেও তাকে জামায়াত কর্মী বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে পাল্টা অভিযোগ উঠেছে।
আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান: পুলিশ
অস্ত্রসহ হাতেনাতে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানান, মোটরসাইকেল आरোহীর গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তাকে চেকপোস্টে থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে তিনটি পিস্তল, আটটি গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে এবং মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়েছে। সে কোনো দলের কর্মী বা কার গাড়ি ব্যবহার করছিল— এই অপরাধের সাথে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। অস্ত্র আইনে মামলাসহ তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুজ্জামান বলেন, আটক রাহিমকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বেগমগঞ্জে অবৈধ অস্ত্রধারী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের এই চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে। গ্রেপ্তার হওয়া রাহিমকে আগামীকাল নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হবে।

