ফুটবল উন্মাদনায় ফের সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মান পতাকা বানিয়ে আলোচনায় কৃষক আমজাদ

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বাঙালি দর্শকদের নানা কাণ্ড বিশ্বজুড়ে নজর কাড়ে। তবে মাগুরার সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ কৃষক আমজাদ হোসেন যা করে দেখিয়েছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য ও অনন্য। চরম অভাব-অনটন এবং পারিবারিক নানামুখী টানাপোড়েন সত্ত্বেও নিজের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে এবারও সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা প্রদর্শন করেছেন তিনি। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং জার্মান পতাকা বানিয়ে আলোচনায় কৃষক আমজাদ এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

আজ ১০ জুন (বুধবার) সকালে মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশাল আকৃতির পতাকাটি স্থানীয় উৎসুক জনতার সামনে প্রদর্শন করা হয়। মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত এই পতাকা দেখতে সকাল থেকেই বিদ্যালয় মাঠে ভিড় জমান হাজারো ফুটবলপ্রেমী মানুষ।

কেন এই জার্মানি প্রীতি? নেপথ্যে এক আবেগঘন গল্প

কৃষক আমজাদ হোসেন মাগুরা পৌরসভার ঘোড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ের জনক। আমজাদের জার্মানির প্রতি এই অন্ধ ভালোবাসার পেছনে রয়েছে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও জীবন বাঁচানোর গল্প।

আমজাদ হোসেন জানান, ২০০৫ সালে তিনি একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রায় নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে দামি চিকিৎসায় কোনো সুফল না পেয়ে তিনি যখন প্রায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, ঠিক তখন জার্মানিতে তৈরি একটি বিশেষ হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করে তিনি সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। রোগমুক্তির পর থেকেই জার্মানি দেশটির প্রতি তাঁর অন্তরে এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ ও বিশেষ অনুরাগ জন্ম নেয়। এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৬ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় দেশটির প্রতি নিজের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রথমবার বিশাল এক পতাকা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন এই ফুটবলপ্রেমী কৃষক।

২০০৬ থেকে ২০২৬: আমজাদের জার্মান পতাকার দৈর্ঘ্যের খতিয়ান:

বিশ্বকাপের সাল ও আয়োজক দেশ আমজাদের তৈরি পতাকার দৈর্ঘ্য জমি বিক্রির পরিমাণ ও খরচ বিশেষ আয়োজন ও অর্জন
২০০৬ (জার্মানি) ১.৫ কিলোমিটার। সাধারণ সঞ্চয় থেকে। জার্মানির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা) ২.৫ কিলোমিটার। পারিবারিক জমানো টাকা। এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ।
২০১৪ (ব্রাজিল) ৩.৫ কিলোমিটার। ২০ শতক জমি বিক্রি (৫ লাখ টাকা) জার্মান রাষ্ট্রদূতের মাগুরা আগমন ও ভোজ।
২০১৮ (রাশিয়া) ৫.৫ কিলোমিটার। কয়েক লাখ টাকা ব্যয়। জার্মান ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ লাভ।
২০২২ (কাতার) ৭.৫ কিলোমিটার। নতুন ২ কিলোমিটার যুক্ত। বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা।
২০২৬ (আমেরিকা/কানাডা/মেক্সিকো) ৭.৫ কিলোমিটার (পুনরায় প্রদর্শন) ১০ শতক জমি বিক্রি জার্মানির জাদুঘরে পতাকা সংরক্ষণের আশা।

ফুটবল প্রেমের মূল্য: বিক্রি করলেন ৩০ শতক জমি!

শুরুর দিকে আমজাদের এই পাগলামির জন্য পরিবারের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। এমনকি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ উপলক্ষে সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা নির্মাণ ও উৎসবের আয়োজন করতে গিয়ে নিজের পৈতৃক ভিটার ২০ শতক জমিও বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। সে সময় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে বাড়িতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে পুরো গ্রামবাসীকে খেলা দেখার ব্যবস্থা করেন এবং জার্মানি বিশ্বকাপ জয়ের পর আস্ত গরু জবাই করে বিশাল ভোজের আয়োজন করেছিলেন।

২০১৮ সালেও এই পতাকা তৈরিতে তাঁর কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। আর চলতি ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে বরণ করে নিতে এবারও শেষ সম্বল ১০ শতক জায়গা বিক্রি করে এই পতাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে কেবল ফুটবল প্রেমের টানে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৩০ শতক জমি বিক্রি করেছেন এই অকুতোভয় ফুটবল ভক্ত। আমজাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বিশাল; আগামী ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে তিনি ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা বানানোর স্বপ্ন দেখছেন।

জার্মান রাষ্ট্রদূতের আগমন ও আজীবন সদস্যপদ লাভ

আমজাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার খবর একসময় পৌঁছে যায় ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাসেও। ফলশ্রুতিতে, ২০১৪ সালে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূত স্বয়ং মাগুরায় এসে আমজাদ হোসেনের এই বিশাল পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছিলেন। একই সঙ্গে আমজাদ হোসেনকে জার্মান দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং জার্মান ফুটবল দলের অফিশিয়াল ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাগুরায় আমজাদের আয়োজনে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন এবং জার্মানির একটি কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে তাঁর জন্য ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ২০২১ সালে সেই ভাতাটি বন্ধ হয়ে যায়। ভাতা বন্ধ হলেও জার্মানির প্রতি আমজাদের ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র চির ধরেনি।

জার্মানির জাদুঘরে স্মারক হিসেবে রাখার আকুল আবেদন

বৃদ্ধ আমজাদ হোসেনের এখন একটাই শেষ ইচ্ছা। তিনি আশাবাদী যে, তাঁর তৈরি এই সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক পতাকাটি ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাসের মাধ্যমে জার্মানির কোনো জাতীয় ফুটবল জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে। আমজাদ হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি হয়তো আর বেশিদিন বাঁচব না, তবে আমার এই পতাকাটি যদি জার্মানির জাদুঘরে স্থান পায়, তবে তা চিরকাল বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এবং এক বাঙালি কৃষকের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্য স্মারক হয়ে টিকে থাকবে।”

সর্বশেষ নিউজ