২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত নৃশংস ও বর্বরোচিত ১০টি হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান এবং তাঁর ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়নসহ ১২ জন হাইপ্রোফাইল আসামির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের প্রথম ধাপ শুরু হলো।
আজ ১০ জুন (বুধবার) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বেঞ্চে প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচার কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। মামলার সকল আসামি বর্তমানে আত্মগোপনে বা পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই আদালত এই বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আদালতে প্রথম সাক্ষীর রুদ্ধশ্বাস জবানবন্দি
সূচনা বক্তব্য শেষ হওয়ার পর শুরু হয় চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব। মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দেন গত ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় গুলিতে নিহত আবুল হাসান স্বজনের বড় ভাই মো. আবুল বাশার অনিক। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
জবানবন্দিতে সরাসরি অভিযোগ তুলে অনিক বলেন, “শামীম ওসমানের ছেলের গুলিতে আমার ভাই মরছে।” তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিনে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সশস্ত্র সহযোগীরা চাষাঢ়া এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। এই তাণ্ডবের একপর্যায়ে শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়নের হাতের পিস্তল থেকে ছোড়া সরাসরি গুলিতে তাঁর ছোট ভাই আবুল হাসান স্বজন ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে নিহত হন।
শামীম ওসমান ও অয়নসহ আসামিদের বিরুদ্ধে মূল ৩টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ:
| অভিযোগ নম্বর | ঘটনার তারিখ ও এলাকা | হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিবর্গ | অভিযুক্ত মূল চক্র |
| ১ম অভিযোগ | ১৯ জুলাই; চাষাঢ়া, সাইনবোর্ড ও আশপাশের এলাকা। | কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাক শ্রমিক রাসেল ও শিশু রিয়াসহ মোট ৬ জন। | শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান ও আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী। |
| ২য় অভিযোগ | ২১ জুলাই; ভূইগড় এলাকা। | আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিব। | স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের চিহ্নিত আসামিরা [cite: ” শামীম ওসমানের চাষাঢ়া, সাইনবোর্ড ও আশপাশের এলাকায়… ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়।”]। |
| ৩য় অভিযোগ | ৫ আগস্ট; চাষাঢ়া এলাকা [cite: ” শামীম ওসমানের ছেলের গুলিতে আমার ভাই মরছে” #ট্রাইব্যুনালে স্বজন হত্যার বর্ণনা, ” শামীম ওসমানের চাষাঢ়া, সাইনবোর্ড ও আশপাশের এলাকায়… হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।”]। | বদিউজ্জামান এবং আবুল হাসান স্বজন। | সরাসরি ইমতিনান ওসমান অয়নের পিস্তলের গুলি। |
কাঠগড়ায় শামীম ওসমানের পুরো পরিবার ও ১২ কুখ্যাত আসামি
ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে শামীম ওসমানের পুরো পারিবারিক সিন্ডিকেট ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের আসামি করা হয়েছে। শামীম ওসমান ও অয়ন ছাড়াও মামলার অন্য ১০ জন আসামিরা হলেন— শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, সাংবাদিক রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ও কামরুল হাসান মুন্না, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, মহানগর যুবলীগের সাবেক সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সোহানুর রহমান শুভ্র।
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল এই মামলার ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে গত ১৩ মে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে এই ১২ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর চূড়ান্ত আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
বর্তমানে আসামিদের বিরুদ্ধে পূর্বের জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই গণহত্যামূলক মামলার বিচারকাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে আসা নিহতদের স্বজনেরা।

