জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করেন তিনি। এটি দেশের ৫৫তম, বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের ও অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট।
বাজেটের আকারের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটের বিশাল এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক— দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩ টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদের বাজেট অধিবেশনে যোগ দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। এছাড়া মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ।
বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে সরকার। এডিপিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। আর ঋণ সহায়তা বা বিদেশি অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
বিশাল অংকের এই বাজেট ও ভর্তুকির ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের হারের চেয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি।
এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যের মধ্যে প্রধান দায়িত্বটি থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের ওপর, যাদের একাই কর হিসেবে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাকি রাজস্বের মধ্যে এনবিআর-বহির্ভূত কর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত বিভিন্ন খাত বা নন-ট্যাক্স রেভিনিউ থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
এনবিআরের আওতায় এবার সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে আয়কর ও মূলধনী মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তাছাড়া সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
বিশাল ব্যয়ের এই প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের তুলনায় খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার মতো নিট বাজেট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।
এর আগে সংসদে উপস্থাপনের আগে প্রস্তাবিত বাজেট মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিলে স্বাক্ষর করেছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে তার অফিস কক্ষে তিনি এ স্বাক্ষর করেন।
উন্নয়ন ও ভর্তুকিতে বিশাল বরাদ্দ
বাজেটের আয় ও ব্যয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বরাবরের মতোই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেখানে আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে। এই উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ বা বৈদেশিক সহায়তা তহবিল থেকে সংস্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ও মেগা প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের গতি ধরে রাখতেই মূলত উন্নয়ন বাজেটে এই বিশাল অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা এবং দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হচ্ছে, যা মূলত গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হবে।
রাজস্ব আদায়ের গুরুদায়িত্ব এনবিআরের কাঁধে
বিশাল অংকের এই বাজেট ও ভর্তুকির ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের হারের চেয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি।
এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যের মধ্যে প্রধান দায়িত্বটি থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের ওপর, যাদের একাই কর হিসেবে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাকি রাজস্বের মধ্যে এনবিআর-বহির্ভূত কর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত বিভিন্ন খাত বা নন-ট্যাক্স রেভিনিউ থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
এনবিআরের আওতায় এবার সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে আয়কর ও মূলধনী মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তাছাড়া সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
রেকর্ড ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা
বিশাল ব্যয়ের এই প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের তুলনায় খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার মতো নিট বাজেট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।
এই ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের পেছনেই চলে যাবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেই আগামী বছরের জন্য দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি প্রগতিশীল লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
৫ বছরের ঐতিহাসিক আয়কর রোডম্যাপ
এবারের বাজেটের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হলো দেশে প্রথমবারের মতো ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য বিদ্যমান করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে, যা ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই রোডম্যাপ অনুযায়ী পরবর্তী দুই করবর্ষ অর্থাৎ ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হবে এবং চূড়ান্ত ধাপে ২০৩০-৩১ করবর্ষে তা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের মধ্যে নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তদ্বূর্ধ্ব বয়সী প্রবীণ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে যথাক্রমে ৫ লাখ, ৫ লাখ ২৫ হাজার এবং ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। আর গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং গণঅভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রত্যেক পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা আয় করমুক্ত হিসেবে গণ্য করার বিশেষ আর্থিক সুবিধা রাখা হয়েছে।
উচ্চ আয়ের ওপর বাড়তি করের থাবা
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী পাঁচ বছরের করহারও আগাম নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে, যেখানে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য বিদ্যমান প্রগতিশীল করব্যবস্থা বহাল থাকলেও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকার পর পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে, অর্থাৎ ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের জন্য সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং এর বেশি আয় হলে অবশিষ্ট অংশের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।
২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ করবর্ষে প্রথম ৪ লাখ টাকা করমুক্ত থাকার পর একই ধাপ অনুযায়ী ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের পর ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ হারে এবং বছরে ৩ কোটি টাকার বেশি আয় হলে অতিরিক্ত অংশের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। ২০৩০-৩১ করবর্ষেও একই ধরনের কাঠামো বহাল থাকবে, তবে করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হবে এবং এরপর ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে করহার থাকবে ৩০ শতাংশ এবং ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ ঘোষণার মাধ্যমে করব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে, নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রেকর্ড রাজস্বের টার্গেট পূরণ করা এবং ব্যাংক খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বিপুল এই ঘাটতি বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করাই হবে বর্তমান সরকারের জন্য মূল পরীক্ষা।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে
শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের জন্য শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ সমপরিমাণ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। গত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠবে। শিক্ষা কারিকুলামের রূপান্তরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানবিক চরিত্রের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য আধুনিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে তাদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা বিকাশের পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় গবেষণা ও উদ্ভাবনে পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি, বিদেশে অবস্থানরত উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষার মতো আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ পাবে। এ লক্ষ্যে তৃতীয় ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে আগ্রহীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাক্রমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্যোক্তা, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী কিংবা ক্রীড়াবিদ হিসেবে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
ব্যাংকে ৪ লাখ টাকা জমা রাখলে দিতে হবে না আবগারি শুল্ক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকে জমা রাখা টাকার ওপর আবগারি শুল্ক মওকুফের সীমা বাড়াচ্ছে সরকার। আগামী অর্থবছর থেকে যাদের ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকবে, তাদের কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না।
বর্তমানে কোনো গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে বছরে তিন লাখ টাকার পর্যন্ত জমার বিপরীতে কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হয় না। আর তিন লাখ এক টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা হলে একশ ৫০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হয়। সেটি বাড়িয়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী।
শিশুখাদ্য আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব
শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক হ্রাস করা হবে বলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রস্তাবে জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আমদানিকৃত শিশু খাদ্য প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীর (Preparation for Infant or young children) ওপর শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম হ্রাস পেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সুলভ ও সহজলভ্য হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে করের চাপ কমিয়ে বিনিয়োগ ও সরবরাহ কার্যক্রম সহজ করতে উৎসে কর কর্তনের হার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার বর্তমান ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে এবং খাতটির কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব বক্তব্যে তিনি বলেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে।
বিগত সরকারের সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের উপর চেপে বসেছে। এ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯শ ১৯ মেগাওয়াট (আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্যসহ) হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
মন্ত্রী বলেন, আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমাদের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগসমূহ হচ্ছে— বিদ্যুতখাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধপূর্বক এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিদ্যুৎ খাতে নিবিড় মনিটরিং, অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন এবং ‘লিস্ট কস্ট জেনারেশন’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে এ খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড উন্নয়নের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ এবং দুই হাজার চারশ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে প্রথম ইউনিট হতে জানুয়ারি ২০২৭ নাগাদ ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি উল্লিখিত উদ্যোগসমূহের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা দেশে তুলনামূলক সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা ও আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি খাত গভীর সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন, রিফাইনিং সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আমদানি উৎস বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী তিন বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে ৬৯টি কূপ খননসহ একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, আগামী ৩ বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কি.মি ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কি.মি টু-ডি সাইসমিক জরিপ এবং ৭০০ বর্গ কি.মি থ্রি-ডি সাইসমিক জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন, মধ্যমেয়াদে বাপেক্স এর নিজস্ব রিগ দ্বারা ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি কূপের ওয়ার্কওভার সম্পন্ন, জ্বালানি অনুসন্ধানে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অনুসন্ধান রিগ ক্রয়, সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণা, অফসোর গ্যাস অনুসন্ধান আকর্ষণীয় করার জন্য দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট সংশোধন, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎস বহুমুখীকরণ নীতি অনুসরণ, মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি পর্যালোচনা, মহেশখালীর মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্তকরণ, জ্বালানি তেল পরিবহণে নির্মিত ৬০১.৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার, জ্বালানি তেল খালাসে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং চালুর উদ্যোগ গ্রহণ,চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ টন পরিশোধন ক্ষমতা সম্পন্ন নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণ করা হবে।
বাজেটে ইমাম-পুরোহিতদের জন্য সুখবর
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সারাদেশে ধর্মীয় উপাসনালয়ে ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় এ প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মোট ১০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পুরোহিত ও সেবায়েতদের মোট ৮ হাজার টাকা মাসিক সম্মানী দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৩৮টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ হাজার ৫২০ জন এই সুবিধার আওতায় এসেছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে, ওয়াকফ সম্পত্তির অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও উদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১১টি ওয়াকফ এস্টেটের মোট ২৮ দশমিক ২০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
৬৪ জেলায় হচ্ছে স্পোর্টস ভিলেজ
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এরইমধ্যে ৩০০ জন ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়া ভাতা দেওয়া হয়েছে। সরকার ৬৪টি জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেটির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১০টি জেলায় স্পোর্টস ভিলেজের প্রাথমিক নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ১২-১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হবে। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট, মোট ৮টি খেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ এ সারা দেশ থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ৪৯২ জন কিশোর ও ৪৭ হাজার ১৩০ জন কিশোরীসহ মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬২২ জন খেলোয়াড় নিবন্ধন করেছে। এ লক্ষ্যে এই অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে।
কৃষক কার্ডে টাকা পাবেন প্রান্তিক কৃষকরা
দেশের ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য চালু হওয়া ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় বছরে একবার ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে দেশের ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকেরা প্রতি বছর একবার ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে নেওয়া সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদসহ মওকুফ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ খাতে চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল সিমের ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব
মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আইসিটিকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার এ খাতে ট্যাক্স, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালা সংস্কারের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে টেলিকম সেক্টরে করের হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তা প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। তাই এ খাতের বিকাশে সরকার এ ধরনের ট্যাক্স ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক হারে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
একাধিক গাড়ি থাকলেই দিতে হবে পরিবেশ সারচার্জ
কোনো ব্যক্তির নামে একাধিক গাড়ি বা মোটরযান থাকলে অতিরিক্ত সারচার্জ দিতে হবে। যা পরিবেশ সারচার্জ হিসেবে পরিচিত। আগের মতোই একের অধিক গাড়ি থাকলে এবারও বিভিন্ন হারে পরিবেশ সারচার্জ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাবনা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো ব্যক্তির নামে একাধিক মোটরগাড়ি থাকলে প্রত্যেকটি গাড়ির জন্য সারচার্জ দিতে হবে। ১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জের হার ২৫ হাজার টাকা, ১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য ৫০ হাজার, ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ২৫০০ সিসি বা ১২৫ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য ৭৫ হাজার, ২৫০০ সিসি বা ১২৫ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াটের অধিক নয়, এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য দেড় লাখ টাকা, ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য দুই লাখ টাকা এবং এর চেয়েও বেশি সিসি বা কিলোওয়াট হলে অর্থাৎ সাড়ে তিন হাজার সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের অধিক প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা সারচার্জ দিতে হবে।
তবে শর্ত থাকে যে, একাধিক গাড়ির ক্ষেত্রে যে গাড়ির ওপর সর্বনিম্ন হারে পরিবেশ সারচার্জ আরোপিত হবে ওই গাড়ি ব্যতীত অন্যান্য গাড়ির বিপরীতে পরিবেশ সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে। পরিবেশ সারচার্জ গাড়ির নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নকালে নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উৎসে সংগৃহীত হবে।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

