রংপুরে আলুর বাজারে ৩ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা লোকসানের মুখে কৃষক

রংপুর কার্যালয়
spot_img
spot_img

রংপুর অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও তা কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি; উল্টো লোকসানের আশঙ্খায় তাদের দিন কাটছে চরম হতাশায় । অসময়ের বৃষ্টিতে খেতের আলু ভিজে যাওয়ায়, তা রোদে শুকিয়ে ঘরে তুললেও শেষ রক্ষা হয়নি- পচন ধরে নষ্ট হচ্ছে। এর ওপর বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব, সংরক্ষণ খরচ বৃদ্ধি এবং হিমাগারের সীমিত সক্ষমতা যেন কৃষকদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার আলু চাষির দিন কাটছে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায়।

উৎপাদন খরচের অর্ধেকও মিলছে না বাজারে
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানান, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ১৪ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমাগার ভাড়া, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন ব্যয়।
সবচেয়ে বড় বিপত্তি দেখা দিয়েছে আলুর পচন ধরায়। বাড়িতে ও হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলুতে পচন ধরায় প্রতিদিনই বস্তা বস্তা পচা আলু ফেলে দিতে হচ্ছে কৃষকদের, যা তাদের লোকসানের পাল্লাকে আরও ভারী করছে। বাম্পার ফলনের যে আনন্দ মৌসুমের শুরুতে ছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে কান্নায়।

পচনেই ক্ষতি ৩৮৮ কোটি টাকা
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৬ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এতে মোট উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন। তবে এই বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের জন্য পুরো অঞ্চলে হিমাগার রয়েছে মাত্র ১১৫টি, যার সম্মিলিত ধারণ ক্ষমতা ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন।

কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এবার রংপুর অঞ্চলে আলু উৎপাদনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৭৬৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং হিমাগার ভাড়া বাবদ খরচ হয়েছে আরও ১০৫ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ আলু পচে নষ্ট হওয়াতেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে, বর্তমান বাজারদরের ধসের কারণে রংপুর অঞ্চলের কৃষকেরা এবার প্রায় ৩ হাজার ৬৯১ কোটি টাকার বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছেন।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
রংপুর হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানে আলু উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক আলু রপ্তানির বাজার মূলত তাদের দখলেই রয়েছে। আমাদের দেশে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা টিকতে পারছেন না।”
তিনি আরও বলেন, আলুর উৎপাদন খরচ কমাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা অসম্ভব। পাশাপাশি কৃষকেরা যাতে মানসম্মত বীজ, সার ও কীটনাশক পান এবং কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্য সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

রপ্তানি না বাড়লে আলু আবাদ ছাড়বেন কৃষকেরা
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন চমৎকার হয়েছিল। কিন্তু বাজারমূল্য কম থাকায় কৃষকেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর ওপর ঘরে রাখা আলুতে পচন ধরায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “অনতিবিলম্বে বিদেশে আলু রপ্তানির সুযোগ তৈরি ও সম্প্রসারণ করা না গেলে উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা কখনই আলুর ন্যায্যমূল্য পাবেন না। আর এমন ধারাবাহিক লোকসান চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষকই আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।”

সর্বশেষ নিউজ