ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেশার যেভাবে নীরবে শেষ করছে কিডনি

লাইফস্টাইল ডেস্ক
spot_img
spot_img

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) উভয় রোগই বর্তমান সময়ে কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। চিকিৎসকদের মতে, শেষ ধাপের কিডনি রোগীদের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই এই দুটি সমস্যার যেকোনো একটি বা দুটিই রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১১ শতাংশ মানুষ এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগীরা ধীরে ধীরে অন্যান্য জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগ সবচেয়ে সাধারণ, যা একজন মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং গড় আয়ু অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সহাবস্থান কিডনি রোগের গতিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে রোগীর দ্রুত ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। একই সঙ্গে এটি হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ডায়াবেটিস

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রকোপ তুলনামূলক কম এবং এটি সাধারণত কম বয়সে হয়ে থাকে। অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস (যেখানে শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়) মেটাবলিক সিন্ড্রোমের অংশ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপ এবং অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের সঙ্গে একই দেহে বাসা বাঁধে। রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা শরীরের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে মূলত তিনটি বড় জটিলতা দেখা দেয়:

স্নায়ু: হাত-পায়ের স্নায়ু দুর্বল হওয়া (পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি)।

চোখ: রেটিনোপ্যাথি বা চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ম্যাকুলার এডিমা।

কিডনি: ডায়াবেটিক কিডনি রোগ, যার প্রাথমিক লক্ষণ প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন বা অ্যালবুমিন যাওয়া।

চিকিৎসকদের মতে, কেবল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, বরং রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকি কমাতে বিপাকীয় সব বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপের নীরব ক্ষতি

• ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ মিলে কিডনির ক্ষতি দ্বিগুণ করে দেয়।

• এটি কিডনি, চোখ এবং হৃদরোগের একটি স্বাধীন ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।

• বংশগত ইতিহাস, খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ এর জন্য দায়ী।

• অনেক সময় কিডনি রোগের শেষ পর্যায়ে গিয়ে রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, যা মূলত কিডনি নষ্ট হওয়ারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

যখন একসঙ্গে বাসা বাঁধে তিন রোগ

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা করলে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ খুব দ্রুত শেষ ধাপে পৌঁছে যায়। এই অরক্ষিত রোগীদের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং কঠোরভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। কম বয়সে এসব রোগ দেখা দিলে তা মানুষের আয়ু এবং কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।

প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্ক্রিনিং

১. বার্ষিক পরীক্ষা: বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, লিপিড প্রোফাইল, কিডনি, হার্ট এবং লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি।

২. তাড়াতাড়ি পরীক্ষা: ৩৫ বছরের বেশি বয়সি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত মেটাবলিক স্ক্রিনিং করা উচিত।

৩. নারীদের সচেতনতা: পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা স্থূলতা থাকলে নারীদের কম বয়স থেকেই স্ক্রিনিং করা উচিত। বিশেষ করে যারা মা হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের ক্ষেত্রে মা ও শিশুর সুরক্ষায় এটি অত্যন্ত জরুরি।

৪. পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে অথবা ঘন ঘন ইনফেকশন, অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে আরও আগেই পরীক্ষা করাতে হবে।

সুরক্ষার উপায় ও ব্যবস্থাপনা

সুস্থ জীবনধারা:

• শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পুরুষের কোমরের মাপ ৯০ সেমি এবং নারীর ক্ষেত্রে ৮০ সেমির নিচে থাকা ভালো।

• খাবারে লবণের পরিমাণ কমাতে হবে এবং অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

• বিএমআই ২৩-এর মধ্যে (সর্বোচ্চ ২৫) রাখা উচিত।

কঠোর নিয়ন্ত্রণ: হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে এবং কিডনির ক্ষতি ধীর করতে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আজকাল চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘SGLT2 ইনহিবিটরস’ এবং ‘GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট’-এর মতো আধুনিক ওষুধ এসেছে, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কিডনি সুরক্ষায় দারুণ কার্যকর। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপের ওষুধ এবং কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন করতে হবে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সচেতন উদ্যোগ। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনই পারে এই ত্রিমুখী ঝুঁকি থেকে জীবন বাঁচাতে।

সূত্র: এনডিটিভি

সর্বশেষ নিউজ