মদনপুর ট্র্যাজেডি: বাবা-মা ও ভাইয়ের পর চলে গেল মিমও, গ্যাস বিস্ফোরণে নিশ্চিহ্ন একটি পরিবার

নারায়নগঞ্জ কার্যালয়
spot_img
spot_img

নিয়তির চরম নির্মমতা কাকে বলে, তার এক জ্যান্ত ও বুকফাটা উদাহরণ তৈরি হলো নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একে একে নিভে গেল একটি সুখী পরিবারের চারটি তাজা প্রাণ। বন্দরে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে একে একে বাবা, মা ও বড় ভাইকে হারানোর পর এবার মৃত্যুর কাছে হার মানলো ১৩ বছরের অবুজ শিশু মিম। মিমের এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে একটি সাজানো গোছানো পরিবারের শেষ প্রদীপটিও চিরতরে নিভে গেল। দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটি পুরো পরিবার।

আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) ভোররাত ১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মিম। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মিমের শরীরের ৫১ শতাংশই আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়েছিল। আগুনের তীব্র তাপ ও ধোঁয়ায় তার শ্বাসনালীও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

৫ দিনের ব্যবধানে ৪ মৃত্যুর নির্মম ক্রোনোলজি

মিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজন এবং প্রতিবেশীদের কান্নায় বার্ন ইনস্টিটিউটের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কারণ, মিম জানার সুযোগও পায়নি যে তার লড়াই করার আর কেউ বাকি নেই; এর আগেই এই দুর্ঘটনায় সে হারিয়েছে তার পুরো পরিবারকে।

গত ১১ জুনের সেই অভিশপ্ত দুর্ঘটনার পর মৃত্যুর এই মিছিল শুরু হয় মা সুলতানা বেগমকে দিয়ে।

  • ১২ জুন (মায়ের মৃত্যু): চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথম মারা যান মা সুলতানা বেগম (৩৫)। তার শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল।

  • ১৫ জুন ভোরে (বাবার মৃত্যু): পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম কর্তা আব্দুল মান্নান (৫০) ৩৫ শতাংশ দগ্ধ শরীর নিয়ে মারা যান।

  • ১৫ জুন দুপুরে (ভাইয়ের মৃত্যু): বাবার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যান মিমের ১৯ বছর বয়সী বড় ভাই সিয়াম। তার শরীরের ৭৭ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।

  • ১৬ জুন ভোররাত (মিমের বিদায়): সবশেষে ৫১ শতাংশ দগ্ধ মিমের মৃত্যুর মাধ্যমে পুরো পরিবারটিই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিল।

একনজরে মদনপুর গ্যাস বিস্ফোরণ ও মৃত্যুর খতিয়ান:

নিহতের নাম ও বয়স সম্পর্কের অবস্থান দগ্ধের পরিমাণ (%) মৃত্যুর তারিখ ও সময়
সুলতানা বেগম (৩৫) মা ৯০% (গুরুতর) ১২ জুন, ২০২৬
আব্দুল মান্নান (৫০) বাবা ৩৫% (শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত) ১৫ জুন (ভোর), ২০২৬
সিয়াম (১৯) বড় ভাই ৭৭% (গুরুতর) ১৫ জুন (দুপুর), ২০২৬
মিম (১৩) ছোট বোন (শেষ সদস্য) ৫১% (শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত) ১৬ জুন (ভোররাত ১:৪০)

অদৃশ্য গ্যাস লিকেজ ও ১১ জুনের সেই অভিশপ্ত ভোর

গত ১১ জুন ভোরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চানপুর এলাকার একটি আবাসিক বাড়িতে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তদন্ত ও তথ্যমতে, রাতের বেলা রান্নাঘরের লাইনে বা সিলিন্ডারে জমে থাকা গ্যাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সকালে আলো ফোটার পর রান্না করার উদ্দেশ্যে দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে আগুন জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ঘরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা আব্দুল মান্নানের পুরো পরিবারকে গ্রাস করে নেয়।

হাসপাতালের আইসিইউর বিছানায় জীবনের শেষ কয়েকটি দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছে ছোট্ট মিম। কিন্তু মা, বাবা ও ভাইয়ের মতো তাকেও শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে নির্মম নিয়তির কাছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখন কেবল বেঁচে আছে প্রতিবেশী ৮ বছর বয়সী এক শিশু, যার নাম হযরত আলী। মাত্র ৮ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় সে এখনও বার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চানপুর এলাকায় শুধুই শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাস

স্থানীদের ভাষ্য, একটি অসতর্কতা বা লাইনের ত্রুটিজনিত গ্যাস বিস্ফোরণে শুধু চারটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি; একটি পুরো বংশের একটি শাখাকে মুছে দিয়েছে। চানপুর এলাকার মানুষ এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, মাত্র কয়েক দিন আগেও যে ঘরে ছিল বাবা-মা ও দুই সন্তানের হাসি-আনন্দ, আজ সেই পরিবারটির কেউ আর বেঁচে নেই।

স্বজনদের কান্নায় বারবার উচ্চারিত হচ্ছে একটাই কথা— “মিমটাও চলে গেল, আর কেউ রইলো না, কাকে নিয়ে বাঁচব?” মদনপুরের এই মহা ট্র্যাজেডি দেশের তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে আবারও সতর্কবার্তা দিয়ে মনে করিয়ে দিল, গ্যাস লিকেজ কতটা ভয়াবহ আক্ষরিক অর্থেই প্রলয় ডেকে আনতে পারে।

সর্বশেষ নিউজ