পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর নিচে মাটি কাটা বন্ধ করল প্রশাসন, পিলারের পাশে ১৫ ফুট গভীর গর্ত!

নারায়নগঞ্জ কার্যালয়
spot_img
spot_img

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর পিলারের ঠিক নিচ থেকে গভীর গর্ত করে বেপরোয়াভাবে মাটি কেটে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র আপত্তি এবং বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হওয়ার পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। রেলওয়ে প্রকল্পের শতভাগ বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় সেতুর সুরক্ষার্থে এই মাটি কাটার কার্যক্রম আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিনের নির্দেশে ফতুল্লা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান নূর দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে এই কাজ বন্ধ করার আদেশ দেন। আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন আবারও সাইটটি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে বিষয়টি দেখেই এসি ল্যান্ডকে পাঠিয়ে কাজটি বন্ধ করে দিয়েছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিছু কাগজপত্র দেখালেও স্থানীয় প্রশাসন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

১৫ ফুট গভীর গর্তে জমছে পানি, আতঙ্কে এলাকাবাসী

সরেজমিনে ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর ৮৪ নম্বর থেকে ৯১ নম্বর পিলারের অংশে ড্রেজার ও শ্রমিক লাগিয়ে অন্তত ১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে সাবাড় করা হয়েছে। সেতুর আশপাশের সাধারণ জমি ও পাশের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক সমান্তরাল উচ্চতায় থাকলেও, পিলারের গোড়ার অংশ কেটে ফেলার কারণে সেখানে বিশাল খাদের সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে সেইসব গর্তে এখন থৈ থৈ করছে পানি, যা পিলারের স্থায়িত্বকে চরম ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আলীগঞ্জের বাসিন্দা মোসলেহ উদ্দিন সজল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোনো বড় ব্রিজের পিলারের নিচে এভাবে মাটি কাটতে আমরা বাপদাদায় কোনোদিন দেখিনি। এত বড় এবং ভারী ট্রেন রানিং অবস্থায় এই রেল সেতুর ওপর দিয়ে যাবে, পিলারের নিচে মাটি কাটলে তো যে কোনো সময় ধসে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, এক বছর আগেও একবার মাটি কাটার চেষ্টা হলে জনগণের বাধার মুখে তা বন্ধ হয়। কিন্তু মাসখানেক ধরে পুনরায় চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পরও সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার সকালেও গোপনে মাটি কাটা হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

পদ্মা রেল সেতু এলাকায় মাটি কাটার বর্তমান পরিস্থিতি:

ক্ষতিগ্রস্ত পিলারের নম্বর মাটি কাটার গভীরতা স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থান রেলওয়ে ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি
৮৪ থেকে ৯১ নম্বর পিলার, আলীগঞ্জ, ফতুল্লা। কমপক্ষে ১৫ ফুট গভীর গর্ত ও খাদের সৃষ্টি। কাগজপত্র সন্তোষজনক না হওয়ায় কাজ আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ চুক্তি অনুযায়ী সাইট আগের অবস্থায় ফেরানোর (রেস্টোরেশন) কাজ।

এটি প্রকল্পের অংশ: দাবি সেতুমন্ত্রী ও রেল প্রকৌশলীর

বিষয়টি নিয়ে আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, “মাটি খুঁড়ে বা চুরি করে নেওয়া হয়েছে, বিষয়টা এ রকম না। ওখানে যখন ব্রিজ হয়েছে, কিছু প্রতিবন্ধকতা বা ছোট ছোট ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়েছিল। অতিরিক্ত মাটি থাকায় ওখান থেকে আবার মই দিয়ে কিছু কিছু জিনিস চুরি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ফলে সার্বিক বিবেচনায় কনস্ট্রাকশনের কাজের সহায়তার জন্য রাখা অতিরিক্ত মাটি সরানো হচ্ছিল।”

অন্যদিকে, রেল সংযোগ প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক অ্যান্ড ওয়ার্কস) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীম বলেন, “এই এলাকাটি আগে নিচু জমি ও জলাশয় ছিল। প্রকল্পের কাজের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড’ নিজস্ব খরচে মাটি-বালু ফেলে ভরাট করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প শেষে সাইটটিকে রেস্টোরেশন বা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। আমাদের কনসালট্যান্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তাদের তত্ত্বাবধানেই ঠিকাদার এই মাটি সরাচ্ছে, যাতে সেফটি নিশ্চিত থাকে।” ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত এই মেগা প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিএনপি নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ও দলের ব্যাখ্যা

এদিকে রেল সেতুর পিলারের নিচের মহামূল্যবান মাটি কেটে স্থানীয় বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে দেওয়ার পেছনে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে।

তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু। তিনি বলেন, এই মাটি কাটার কাজ সম্পূর্ণ সরকারি প্রকল্পের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনই করছেন। আমাদের দলের কোনো স্তরের নেতা-কর্মীর এই কাজের সাথে বিন্দুমাত্র কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই কেউ কেউ মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “যেকোনো বড় প্রকল্পের কাজ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করাটাই নিয়মের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে রেলওয়ে বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমাদের কিছুই জানায়নি। আমরা তাদের কাছে প্রোপার অফিশিয়াল কাগজপত্র চেয়েছি। যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত আলীগঞ্জে মাটি কাটা সম্পূর্ণ বেআইনি ও বন্ধ থাকবে।”

সর্বশেষ নিউজ