চট্টগ্রামের ইপিজেড থানা এলাকায় পাঁচ বছরের ফুটফুটে শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার রোমহর্ষক ও আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে আসামিকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতক আবীর আলী কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল।
‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে অপহরণ ও লাশ ৬ টুকরো করার বীভৎস ছক
মামলার বিবরণী ও পিবিআই-এর তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার ৫ বছরের শিশুকন্যা আলিনা ইসলাম আয়াত হঠাৎ নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলে ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্তে উঠে আসে এক গা শিউরে ওঠা ভয়ঙ্কর তথ্য। সোহেল রানার বাসার ভাড়াটে আবীর আলী বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ আদায়ের লোভে আয়াতকে নিখোঁজের দিনই অপহরণ করে। পরবর্তীতে আয়াতে চিৎকার করার চেষ্টা করলে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে ভারতীয় অপরাধবিষয়ক সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে লাশটি বাথরুমে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছয় টুকরো করে এবং পলিথিনে মুড়িয়ে সাগরের আবর্জনা ও স্থানীয় খালে ভাসিয়ে দেয়।
শিশু আয়াত হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় ও আইনি খতিয়ান:
| ভুক্তভোগী ও বয়স | নিখোঁজ ও গ্রেফতারের তারিখ | প্রধান আসামি ও সাজা | আদালতের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য |
| আলিনা ইসলাম আয়াত (৫ বছর) | ১৫ নভেম্বর, ২০২২ নিখোঁজ; ২৫ নভেম্বর আবীর গ্রেফতার। | প্রধান ঘাতক আবীর আলীর মৃত্যুদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা। | এই অপরাধটি পূর্বপরিকল্পিত, সমাজ বিধ্বংসী ও চরম নিষ্ঠুরতায় পূর্ণ। |
৩৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও পিবিআই-এর জোরালো চার্জশিট
ঘটনার পর ঘাতক আবীর আলীকে গ্রেফতার করা হলে সে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরবর্তীতে পিবিআই-এর তৎকালীন পরিদর্শক মনোজ দে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর আদালতে দুই জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে আবীর আলী এবং তার এক ১৭ বছর বয়সী কিশোর বন্ধুকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত সহযোগী কিশোর হওয়ায় তার মামলাটি বর্তমানে শিশু আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আজকের রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী এবং সরকারি কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আসামি আবীর আলীর নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, আলামত উদ্ধার, ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট এবং রাষ্ট্রপক্ষের ৩৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত।”
“নিষ্ঠুর, নৃশংস ও সমাজ কাঁপানো ক্রাইম”: আদালতের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞ বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত, চরম নিষ্ঠুর, অবর্ণনীয় নৃশংস এবং সমাজে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টিকারী একটি অপরাধ। টেলিভিশনের অপরাধমূলক অনুষ্ঠান দেখে যেভাবে এই বীভৎস খুনের ছক সাজানো হয়েছে, তা সভ্য সমাজের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। এই ধরণের অপরাধীদের সমাজে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।
এদিকে আয়াতে স্বজনরা আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আয়াতের বাবা সোহেল রানা অশ্রুসজল চোখে বলেন, “আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে যেভাবে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল, আজ ঘাতকের ফাঁসির রায়ের মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। আমরা চাই এই রায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নরপশু আর কোনো শিশুর ওপর এমন হাত তোলার সাহস না পায়।”

