নারায়ণগঞ্জের দূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থার আশ্বাস পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর: ইটিপি ট্র্যাকিং ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধের উদ্যোগ

নারায়নগঞ্জ কার্যালয়
spot_img
spot_img

নারায়ণগঞ্জের নদী ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে কার্যকরভাবে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহার না করাকে দায়ী করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে দূষণের উৎসগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সোমবার (২২ জুন) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ নগরীর কালীর বাজারে অবস্থিত জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতার উৎসব শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এবং জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন ট্র্যাকিংয়ের আওতায় পাওয়ার প্লান্ট: ইটিপি কার্যকরে কড়া নজরদারি

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের পানি দূষণের মূল কারণ হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আমাদের যে ইটিপি প্লান্টগুলো আছে, সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না। ঢাকা, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ সব নদীতেই এই ধরনের সমস্যা হচ্ছে।” তিনি জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এবং সব পাওয়ার প্লান্টকে অনলাইনে ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে তারা ইটিপি বা এটিপি ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।

ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল রাখার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নদী ও সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে পরিবেশ সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।” অনেক প্রতিষ্ঠান ইটিপি চালাতে পারছে না উল্লেখ করে তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টিও দেখা হবে। এছাড়া, সেন্ট্রাল ইটিপি থাকা সত্ত্বেও ট্যানারি বর্জ্যের চাপ সামলাতে না পারার বিষয়টি নিয়ে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এক নজরে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ও পরিবেশের চিত্র:

খাতের নাম বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা
শিল্পবর্জ্য ও ইটিপি অধিকাংশ ইটিপি সঠিকভাবে কাজ করছে না; নদী দূষণ তীব্র। পাওয়ার প্লান্টগুলো অনলাইন ট্র্যাকিংয়ের আওতাধীন; ইটিপি তদারকি জোরদার।
ইটভাটা দূষণ দেশে মোট ৮ হাজার ইটভাটার মধ্যে প্রায় ৫ হাজারই অবৈধ। বৈধ-অবৈধের তথ্য সংগ্রহ; ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়াতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা।
জনবল কাঠামো জেলাগুলোতে মাত্র ২-৩ জন কর্মকর্তা নিয়ে চলছে পরিবেশ অধিদপ্তর। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ফাঁকি রোধ ও কঠোর পদক্ষেপ।
দেশের ৫ হাজার ইটভাটাই অবৈধ, ব্লকের অগ্রগতিতে ধীরগতি

ইটভাটার দূষণ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫ হাজারই অবৈধ এবং মাত্র ৩ হাজারের কাছাকাছি বৈধ। আগের সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে প্রচলিত ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক বা অন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি চালু করা, তবে সেই অগ্রগতি আশানুরূপ হয়নি।

তিনি বলেন, “অগ্রগতি হয়তো ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ হয়েছে। আমরা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এই খাতকে দ্রুত পরিবর্তন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করব।” প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী বছরের মধ্যে দূষণ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

জনবল সংকটের অজুহাতে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই

পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “পরিবেশ ও বন অধিদপ্তরসহ সরকারের অধিকাংশ জায়গায় পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল কম। কোনো কোনো জেলায় মাত্র দুই-তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।”

তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আন্তরিকতা থাকলে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অনেক কাজই করা সম্ভব। তিনি বলেন, “প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে, এখানে অজুহাত দিয়ে বা দুর্বলতা প্রকাশ করে লাভ নেই।”

সর্বশেষ নিউজ