লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরশহরের ব্যস্ততম ধানহাটা নদীপাড় এলাকায় মা ও তিন মেয়েকে ঘরে ঢুকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গভীর রহস্য ও ধোঁয়াশা কাটেনি। এ ঘটনায় পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য ও নিহত শাহিনুর বেগমের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ হোসেন সিফাত বাদী হয়ে শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে রায়পুর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন। সিফাত তার দায়ের করা এজাহারে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য ও নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
টাকার লোভ নাকি পুরোনো আক্রোশ?
পৌরশহরের আমির হোসেন মাস্টারের চারতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ডাকাতি নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তা নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন চলছে। রায়পুর পৌর বণিক সমিতির সভাপতি ও সিফাতের দোকান মালিক সফিকুল ইসলাম মুরাদ জানান, ভবনের মালিক আমির হোসেন মাস্টার ওই ভবনে না থাকায় ভাড়াটিয়াদের মাসিক ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সাথে দেখতেন নিহত শাহিনুর বেগম (৩৮)। ফলে প্রতি মাসে তার কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা জমা থাকত।
অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদার (২৮) প্রায় আট মাস আগে ওই ভবনের পঞ্চম তলায় ভাড়া থাকতেন। পূর্বের ভাড়াটিয়া হিসেবে শাহিনুরের কাছে টাকা ও স্বর্ণালংকার জমা থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের একাংশের ধারণা, প্রধানত টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যেই অন্তর ওই বাসায় ছেনি ও পাটার শিল নিয়ে প্রবেশ করেছিল। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর পেছনে অন্য কোনো পুরোনো আক্রোশ বা মোটিভ আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ৫ তলা ভবনের নিচতলায় ঢুকে শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজোমেয়ে নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) এবং ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার শিফাকে (১০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘাতক অন্তরকে গণপিটুনি ও পুলিশের মামলা
হত্যাকাণ্ড চলাকালীন ভুক্তভোগীদের চিৎকার শুনে প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী তাৎক্ষণিকভাবে বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বাইরে থেকে ঘরের প্রধান গেট লক করে দেন। ফলে ঘাতক অন্তর মজুমদার ঘরের ভেতরে আটকা পড়ে। পরে সে ভবনের ছাদে উঠে পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে উত্তেজিত স্থানীয় জনতা তাকে ধরে গণপিটুনি দেয়। গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই অন্তরের মৃত্যু হয়। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানিয়েছেন, ঘাতক অন্তরকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি পৃথক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
হোমনায় চোখের জলে শেষ বিদায়
শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে মা ও তিন মেয়ের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর বাদ জুমা রায়পুরের পৌর দেনায়েতপুর এলাকার ভাড়া বাসার সামনে নিহতদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহগুলো স্বজনরা কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নটিয়া গ্রামে নিয়ে যান। সেখানে সরকার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হবে।
নিহত শাহিনুরের ভাই ছানা উল্যা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“বোনকে যতবার গ্রামে চলে আসতে বলেছিলাম, ততবারই ও বলেছে রায়পুরেই ভালো আছে, ছেলে-মেয়েরা এখানে ভালোভাবে মানুষ হবে। অথচ যে জায়গাকে ও সবচেয়ে নিরাপদ ভেবেছিল, সেখানেই মেয়েদের নিয়ে ওর জীবন শেষ হয়ে গেল! আমাদের কোনো শত্রু ছিল না, আমরা শুধু এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
আইনি পদক্ষেপ: ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন

