চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিতকরণের মহাপ্রাচীরসম কঠোর অভিযান এবার আরও বিধ্বংসী রূপ নিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ স্তরে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়ে চীনের জাতীয় আইনসভা— ‘ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস’ (NPC) থেকে পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) ছয়জন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং শীর্ষস্থানীয় জেনারেলকে একযোগে অপসারণ করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির জারি করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযানের কথা জানানো হয়। সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসন মিলিয়ে মোট ১৩ জন শীর্ষ আইন প্রণেতাকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একজন পদত্যাগ করেছেন।
যে ৬ হাই-প্রোফাইল জেনারেল পদ হারালেন
অপসারিত সামরিক কমান্ডারদের তালিকায় রয়েছেন চীনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটার ও উইংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিনের গুঞ্জন ও পার্টি বৈঠকে অনুপস্থিতির পর অবশেষে তাদের ওপর চূড়ান্ত কোপ পড়ল। অপসারিত কর্মকর্তারা হলেন:
-
জেনারেল জু জুয়েকিয়াং: সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ইকুইপমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের সাবেক প্রধান। (গত অক্টোবরের হাই-লেভেল মিটিংয়ে অনুপস্থিত ছিলেন)।
-
লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াং কাংপিং: ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা।
-
লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়িন হংক্সিং: তিব্বত মিলিটারি কমান্ডের পলিটিক্যাল কমিসার।
-
জেনারেল লি ফেংবিয়াও: ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের অত্যন্ত প্রভাবশালী পলিটিক্যাল কমিসার।
-
জেনারেল গুও পুক্সিয়াও: চীনা বিমান বাহিনীর পলিটিক্যাল কমিসার।
-
লেফটেন্যান্ট জেনারেল ঝাং মিংহুয়া: সাইবার স্পেস ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডার।
⚠️ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ধস: ২০২২ সালের পার্টি কংগ্রেসে সেন্ট্রাল军事 কমিশনের (CMC) যে ৭ জন শীর্ষ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, এই ঝড়ের পর তাদের মধ্যে এখন মাত্র ২ জন বহাল আছেন! তারা হলেন খোদ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পিএলএর দুর্নীতিবিরোধী প্রধান ঝাং শেংমিন।
রেহাই পাননি শিনজিয়াং প্রধান ও আর্থিক নিয়ন্ত্রক
শুক্রবারের এই অভিযানে শুধু সামরিক বাহিনীই নয়, বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে চীনের রাজনৈতিক ও আর্থিক খাতের শীর্ষ আমলারাও। অপসারিত বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম মা জিংরুই। তিনি শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সাবেক পলিটব্যুরো সদস্য ও পার্টি প্রধান ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে তাকে অপসারণের পর এপ্রিলে সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশন (CCDI) তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।
পাশাপাশি, গুয়াংজুর সাবেক পার্টি সেক্রেটারি গুও ইয়ংহাং এবং ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক পরিচালক লি ইউনজেকেও আইনসভা থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। মে মাসেই লি ইউনজের সমস্ত পরিচিতি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছিল।
সম্পাদকীয় খতিয়ান: বেইজিংয়ের ক্ষমতা কাঠামোর রদবদল
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই সাম্প্রতিকতম ক্র্যাকডাউনের মূল কেন্দ্রবিন্দুগুলো এক নজরে:
| সেক্টর (Sector) | বরখাস্তের সংখ্যা (Expulsions) | মূল টার্গেট ও বর্তমান স্ট্যাটাস (Key Target Status) |
| পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) | ০৬ জন জেনারেল | বিমান বাহিনী, সাইবার স্পেস ফোর্স, তিব্বত ও ওয়েস্টার্ন কমান্ডের প্রধানদের অপসারণ। |
| আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব | ০২ জন শীর্ষ নেতা | শিনজিয়াংয়ের সাবেক পার্টি প্রধান মা জিংরুই ও গুয়াংজুর গুও ইয়ংহাংয়ের বিরুদ্ধে সিসিডিআই-এর তদন্ত। |
| আর্থিক খাত (Finance Sector) | ০১ জন শীর্ষ নিয়ন্ত্রক | ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি প্রধান লি ইউনজের নাম ও পদবি সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়েছে। |
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সামরিক বাহিনীতে সাইবার ও ইকুইপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের জেনারেলদের এই গণ-অপসারণ ইঙ্গিত দেয় যে, চীনের আধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশাল অংকের আর্থিক দুর্নীতি ও গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনা ঘটেছিল। তাইওয়ান সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে শি জিনপিং এমন কোনো জেনারেলকে নেতৃত্বে রাখতে চান না, যাদের আনুগত্য ও সততা নিয়ে সামান্যতম প্রশ্ন রয়েছে। এই অভিযান বেইজিংয়ের ক্ষমতা কাঠামোতে শি-এর একক আধিপত্যকে আরও বেশি নিষ্কণ্টক করল।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

