আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে মোড় ঘোরানো এবং প্রভাবশালী একটি অধ্যায়ের নাম। ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা-ই পরবর্তী ৩৬ দিনের ধারাবাহিক কর্মসূচি, নজিরবিহীন সংঘাত, রক্তক্ষয়ী প্রাণহানি এবং ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ঘটে ৫ আগস্টের শেখ হাসিনা সরকারের পতন। আজ থেকে শুরু হলো বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসের সেই গৌরবময় জুলাই আন্দোলনের তৃতীয় বর্ষপূর্তি।
৫ জুনের প্রেক্ষাপট এবং আন্দোলনের পুনর্জাগরণ
এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের পেছনের আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ জুন। সেদিন সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল সংক্রান্ত ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক সরকারি পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এর ফলে সরকারি চাকরিতে আবারও মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশী ও শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
যদিও তৎকালীন সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করে, তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা আদালতের ওপর একক নির্ভর না করে কোটা সংস্কারের জন্য নতুন নির্বাহী আদেশের দাবিতে রাজপথে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
১ জুলাই: ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সূচনা
২০২৪ সালের ১ জুলাই প্রথমবারের মতো ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একযোগে মাঠে নামেন। আন্দোলনের প্রথম দিনেই রাজধানী ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে সমাবেশ করেন। একই সাথে ৪ জুলাই পর্যন্ত একটানা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কঠোর আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
📌 শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো ছিল: ২০১৮ সালের কোটা বাতিলসংক্রান্ত সরকারি পরিপত্রটি পুনর্বহাল করা, ভবিষ্যতে কোটাব্যবস্থা নিয়ে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন এবং সরকারি চাকরিতে সব ধরনের বৈষম্যমূলক কোটা স্থায়ীভাবে সংস্কার করা।
ক্যাম্পাস থেকে দেশব্যাপী গণআন্দোলন
১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আগুন মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেন। মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, পদযাত্রা ও প্রতীকী সড়ক অবরোধের মাধ্যমে দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ছাত্রজাগরণ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে ১৫ জুলাইয়ের পর থেকে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠী ও তাদের দলীয় অঙ্গসংগঠনগুলোর মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে মোড় নেয়। ১৬ জুলাই থেকে আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মতো বীরদের প্রাণহানির ঘটনা রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নজিরবিহীন দমনপীড়নের পর এই আন্দোলন কোটা সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে এক দফার সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়, যার সমাপ্তি ঘটে ৫ আগস্টের সফল বিপ্লবের মাধ্যমে।
৩. জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের ঐতিহাসিক টাইমলাইন
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে যেভাবে ঐতিহাসিক শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন এসেছিল, তার একটি সংক্ষিপ্ত রোডম্যাপ:
-
৫ জুন ২০২৪: হাইকোর্ট কর্তৃক ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা; ক্ষোভের সূচনা।
-
১ জুলাই ২০২৪: ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানার প্রকাশ ও দেশব্যাপী রাজপথে প্রথম বিক্ষোভ।
-
১৫ – ১৬ জুলাই ২০২৪: শিক্ষার্থীদের ওপর দেশব্যাপী হামলা; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ প্রথম প্রাণহানি ও আন্দোলন রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ।
-
১৮ – ২১ জুলাই ২০২৪: ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি, দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েন।
-
৩ আগস্ট ২০২৪: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ১ দফা ঐতিহাসিক ঘোষণা।
-
৪ আগস্ট ২০২৪: দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন ও ব্যাপক সংঘাত।
-
৫ আগস্ট ২০২৪: ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি; লাখো মানুষের গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ।

